Home » ইতিহাস-ঐতিহ্য » দেশজুড়ে জনপ্রিয় রাজশাহীর শখের হাঁড়ি
দেশজুড়ে জনপ্রিয় রাজশাহীর শখের হাঁড়ি

দেশজুড়ে জনপ্রিয় রাজশাহীর শখের হাঁড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
সুশান্ত কুমার পালের বাড়িতে এখন কারো নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। বাড়ি জুড়ে ব্যস্ততার প্রতিচ্ছবি। পরিবারের একেক জন একেক কাজে ব্যস্ত। কেউ প্রস্তুত করছে মাটি, কেউ তৈরি করছে বিভিন্ন জিনিসপত্র। আবার কেউবা রঙের তুলির শেষ আঁচড় কাটছেন নানা ধরনের শখের হাঁড়িতে।

 

এ ব্যস্ততার কারণ আর মাত্র দু’দিন পরই বাংলা নববর্ষ। রাজশাহীর পবা উপজেলার বাগধানী বসন্তপুর এলাকার ‘ঐতিহ্যবাহী শখের হাঁড়ি’ তৈরির কারিগর সুশান্ত কুমার পাল (৫৯)। তার এই শখের হাঁড়ির জনপ্রিয়তা আজ দেশজুড়ে।

 

মৃতপ্রায় এ মৃৎশিল্প টিকিয়ে আজও জীবিকা নির্বাহ করছেন কারুশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্প আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তিনি। সুশান্ত পালের ভাই সন্তোষ পাল, স্ত্রী মমতা রানী পাল, দুই ছেলে সঞ্জয় কুমার পাল ও মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল, এক মেয়ে সুচিত্রা রানী পাল এবং দুই ছেলের স্ত্রী মুক্তি রানী পাল ও করুণা রানী পাল। তারা সবাই এখন কারুশিল্পী।

 

আধুনিক প্লাস্টিক, সিরামিক, সিন্থেটিক, ধাতব, কাচ এবং মেলামাইন সামগ্রীর দৌর্দণ্ড প্রভাবে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা ফুরিয়েছে অনেক আগেই। তবুও মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে লড়াই করে যাচ্ছেন সুশান্ত পাল ও তার পরিবার। সুশান্ত পালের তত্বাবধানে তৈরি হচ্ছে হাজার বছরের পুরনো শখের হাঁড়ি, পঞ্চসাঞ্জি, মাটির পুতুলসহ বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন তৈজসপত্র। রং, মোটিফ ও নকশায় তার তৈরি রাজশাহীর শখের হাঁড়ি পেয়েছে দেশজোড়া পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশে প্রচলিত শখের হাঁড়ির এখন অন্য নাম দাঁড়িয়েছে ‘রাজশাহীর শখের হাঁড়ি’। উৎসবপ্রিয় বাঙালির প্রতিদিনের জীবন, ধর্ম-সংস্কৃতি, আনন্দ-বেদনা এবং চিন্তার সাথে শখের হাঁড়ি একাকার হয়ে আছে।

 

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির বাইরে শখের হাঁড়ি তৈরিতে বিরামহীন চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছেন সুশান্ত পাল। তাকে সারা দিনে প্রায় ছোট-বড় মিলে ৫০ থেকে ৭০টি শখের হাঁড়ি বানাতে হয়। বাড়িতে পা দিতেই উঠোন জুড়ে কোথাও হাড়ি, কোথাও হাতি-ঘোড়া, কোথাও পঁঞ্চসাধিসহ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মাটির তৈরি উপকরণের নানা সমারোহ। সবগুলোর সামগ্রিক অর্থে নাম দেয়া হয়েছে ‘শখের হাঁড়ি’। বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে ছোট বড় প্রায় ১০ রকমের শখের হাঁড়ি।

সুশান্ত কুমার পাল জানান, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের সোনার গাঁ জাদুঘর চত্বর, ঢাকার বাংলা অ্যাকাডেমি চত্বর, চীনমৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্র চত্বর এবং হাটকো স্কুল চত্বরে মেলার আয়োজন করা হয়। সেসব মেলায় তাদের হাতের তৈরি অন্তত ১০ প্রকারের মাটির জিনিসপত্র থাকবে। যেগুলো কেবলই তৈরি করা হয়েছে পহেলা বৈশাখÑনববর্ষ কেন্দ্র করে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবারের বৈশাখী মেলায় ভালো বেচা-বিক্রি হবে বলে আশা করেন তিনি।

 

সাত বছর বয়স থেকে দাদু ভূবনেশ্বর কুমার পালের হাত ধরে সাত পুরুষের শিল্প চর্চা শুরু করে সুশান্ত কুমার পাল। সেই সাধারণ ছেলেটি আজ পালদের মধ্যে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। অসংখ্য পুরস্কার এখন তার ঝুঁলিতে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পুরষ্কারও পেয়েছেন তিনি।

 

সুশান্ত কুমার পাল বলেন, বাবা-দাদার এই সংস্কৃতিকে বাঁচাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সারা বছর এ শিল্পের তেমন একটা কদর থাকে না। বৈশাখকে ঘিরে তিন মাস আগে থেকে তাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে অর্ডার আসে। অন্যান্য সময় চাহিদা না থাকায় অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়তে হয় তাদের।

 

সুশান্ত কুমার জানান, বিয়াই বিয়াইন বাড়িতে মিষ্টি নেবার কাজে আগে শখের হাড়ি প্রচুর ব্যবহৃত হতো। কোন বাড়ি থেকে কতো বেশি শখের হাঁড়িতে পিঠা, মিষ্টি বা অন্যান্য উপাদান নিয়ে যাবে, সেটার উপর নির্ভর করতো ওই বাড়ির মান মর্যাদা। আগে তো আর রসগোল্লা, চমচম এইগুলো ছিল না। বিভিন্ন পুলি পিঠা রসের হাড়িতে ভরে বিয়াই-বিয়াইন বাড়িতে নিয়ে যেত লোকজন। আর এখন তো মোড়ে মোড়ে মিষ্টির দোকান তৈরি হয়েছে। কাগজের প্যাকেটে করে মিষ্টি নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

 

তবে সুশান্ত কুমার মনে করেন, এতোকিছুর পরও শখের হাড়ি কখনও হারিয়ে যাবে না। তিনি বলেন, আমি শিখেছি দাদুর কাছ থেকে। আমার দুই সন্তানের মধ্য দিয়ে আমি শখের হাঁড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।

 

বাংলার কথা/এপ্রিল ১২, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*