Home » উত্তরের খবর » ডিসি’র প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মনে গেথে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার
ডিসি’র প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মনে গেথে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার

ডিসি’র প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মনে গেথে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
আমাদের জাতীর পিতা সর্ম্পকে কি জান? রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের (হেলেনাবাদ) ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র তোরসা ফাবলিহা নাওয়ালকে জিজ্ঞেস করতেই একনাগারে সে বলে যায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতীর পিতা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাবার্তা ওয়ারলেস যোগে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীকে পাঠিয়ে দেন। চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী প্রচার করেন। পরে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামে অবস্থিত অষ্টম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পুনরায় পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন একটি দেশ পেয়েছি, বাংলাদেশ। তিনি বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে বারবার কারাবরণ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্রে বিপদগামী কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হন।’

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে এভাবেই গেথে দিচ্ছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের। তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলার সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’। রাজশাহীর প্রায় ২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু কর্ণারের বই, তথ্যচিত্র, ছবি দেখে এবং পড়ে তোরসা ফাবলিহা নাওয়ালের মতো নতুন প্রজন্ম থেকে বর্তমানে প্রজন্মের সব শিক্ষার্থী জানতে পারছে বঙ্গবন্ধুকে। তারা জানতে পারছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, রক্ষা পাচ্ছে ইতিহাস বিকৃতি থেকে।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের বলেন, যার জন্য আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, বাঙালি জাতি যার কাছে ঋণী, সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাল থেকে কালান্তরে সবাই জানবে, কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে আমরা সবাই এটি আশা করি। দায়িত্ববোধের এই জায়গা এবং হৃদয়ের তাগিদ থেকে আমি জাতির পিতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে রাজশাহী জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাজশাহী নগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন একযোগে বঙ্গবন্ধু কর্ণার উদ্বোধন করেছেন। একইদিন জেলার সব উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় অন্যান্য জনপ্রতিনিধি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে একসাথে বঙ্গবন্ধু কর্ণার উদ্বোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য কোথাও এটি নেই। শুধুমাত্র রাজশাহী জেলায় আমরা একযোগে বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন করেছি।

জেলা প্রশাসক বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, ১৯২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মের পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাঙ্গালি জাতির জন্য, বাংলাদেশের জন্য যা করে গেছেন, তার যে অবদান রয়েছে, সেগুলো স্তরে স্তরে বঙ্গবন্ধু কর্ণারে সাজানো রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুকে লেখা অন্যার‌্য লেখকের বই বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্তর এবং বয়স বিবেচনায় নিয়ে আমরা এসব কর্ণার সাজিয়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের উপযোগি বইগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রেখেছি। উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ লেভেলের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের উপযোগি বইগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানের বঙ্গবন্ধুরে ঠাঁই পেয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের উপযোগি বই, বঙ্গবন্ধুর ওপর বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ বিশ^বিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রেখেছি। একই সাথে শৈশবকাল থেকে শুরু করে ৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের ঐতিহাসিক সব ছবি আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বঙ্গবন্ধু কর্ণারে স্থাপন করেছি। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি বাচ্চা যখন বঙ্গবন্ধু কর্ণারে যাবে, সেখানে ছবি দেখেই তারা বঙ্গবন্ধুকে চিনতে পারবে, জানতে পারবে। বঙ্গবন্ধু বিদেশি মানুষদের সাথে কথা বলছেন, জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফিরে আসছেন এককথায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সব ছবি বঙ্গবন্ধু কর্ণারে আমরা সাজিয়ে রেখেছি। এসব ছবি দেখে শিশুরা তার সর্ম্পকে জানতে আগ্রহী হচ্ছে। তাদের শিশু মনে বঙ্গবন্ধু স্থান করে নিচ্ছে।

জেলা প্রশাসকএস এম আব্দুল কাদের সময়ের আলোকে বলেন, বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, কার নেতৃত্বে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য কি কি করেছেন, বাঙালি জাতির জন্য তিনি কি কি করেছেন, সমস্ত বিষয়গুলোর নির্মোহ ইতিহাস তারা জানবে। বঙ্গবন্ধু কর্ণারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পুরোটিই লিখিত আকারে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, স্কুলের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন বঙ্গবন্ধু কর্ণার থেকে বই নিয়ে যেতে পারবে এবং এক সপ্তাহ নিজের বাড়িতে রেখে বই পড়ে আবার বঙ্গবন্ধু কর্ণারে জমা দেবে।

শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু কর্ণারে নিয়মিত যাচ্ছে কিনা এবং সেখানে রাখা বই তারা পড়ছে কিনা, তার মূল্যায়ন করতেও ব্যতিক্রর্মী উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কর্ণারের ওপরে আমরা প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকি। বঙ্গবন্ধু কুইজ প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধু কর্ণার রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। যার ফলে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সহজেই বঙ্গবন্ধুকে জানতে পারছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু কর্ণারগুলো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত এসব কর্ণার পরিদর্শন করেন। প্রতিটি কর্ণারে একটি রেজিস্টার রাখা হয়েছে। কতোজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা অভিভাবক বঙ্গবন্ধু কর্ণারে এসে কি কি বই পড়লো, সেসব এই রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রতি মাসে যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, তার মাধ্যমে কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্ণার থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমৃদ্ধ করছে, সেসব তথ্য আমাদের সামনে চলে আসে। এছাড়া প্রতি মাসে জেলার মাসিক উন্নয়ন সভায় জেলা পর্যায়ের সকল কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার নিয়ে আমরা আলোচনা করে থাকি।

বদলি হয়ে যাবার পরেও জেলার সকল প্রতিষ্ঠানে স্থাপতি বঙ্গবন্ধু কর্ণার যাতে স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতে এ ধরণের কর্ণার স্থাপন করা হয়, সে বিষয়ে সরকারের উচ্চমহলে প্রস্তাব পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছেন জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, সারাদেশের সকল প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্ণার স্থাপন করা গেলে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা থেকে আর কেউ বিচ্যুত করতে পারবে না। তাদের প্রত্যেকের অন্তরে লালিত হবে বঙ্গবন্ধু। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হবে তারা।

বাংলার কথা/এপ্রিল ০৪, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*