Home » ইতিহাস-ঐতিহ্য » উদয়ের পথে শুনি কার বাণী….
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী….

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী….

হাসান মীর

আজ ১৮ই ফেব্রুয়ারি, জাতীয় শিক্ষক দিবস। দেশে শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই দিনটি পালন করা হয়।

 

তবে আজকের এই দিনটি আরও একটি কারণে গত ৫০ বছর ধরে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক (তখন বলা হতো রিডার), প্রক্টর ও শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক ডক্টর সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

 

সারা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ জুড়ে তখন চলছিল সেনাশাসক- প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বিরোধী ব্যাপক গণআন্দোলন। আন্দোলন দমাতে তৎপর পাকিস্তানি শাসকচক্রের পুলিশ উনসত্তরের ২০শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করে। ঢাকা সেনানিবাসে আটক তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ই ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয়। এর বিরুদ্ধে সারাদেশ তখন উত্তাল। কারফিউ আর ১৪৪ ধারা কোনো কাজে আসছে না।

 

১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করবে। প্রবেশপথগুলিতে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র হাতে প্রস্তুত। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে প্রক্টরের দায়িত্বে থাকা ডক্টর জোহা এগিয়ে গেলেন, সৈন্যদের বোঝাবার চেষ্টা করলেন- ‘তোমরা গুলি করো না, আমি ছাত্রদের বুঝিয়ে বলছি।’

 

শোনা কথা, এক পাকিস্তানি সৈনিক নাকি ডক্টর জোহার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন : আমি এখানকার একজন রিডার, অশিক্ষিত সৈনিকটি রিডার কী জানতো না, সে শুনলো ‘লিডার’। রাইফেল উঁচিয়ে বললো — তুম লিডার হ্যায় (তুমি এদের নেতা?)।

 

তারপর গুলি ও বেয়োনেট চার্জ। তাঁকে সময়মতো হাসপাতালেও নেওয়া হয়নি। বলা হয়ে থাকে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই প্রথম একজন শিক্ষক অন্যায়ের প্রতিবাদ আর সত্যের পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে এভাবেই জীবন দিয়েছিলেন।

 

শহীদ জোহাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই সমাহিত করা হয়। আর প্রতিবছর ১৮ই ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ‘শহীদ ডক্টর জোহা দিবস’ হিসাবে। তাঁর নামে একটি আবাসিক ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়েছে। (একই দিনে রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী নূরুল ইসলাম খোকাও ইপিআরের গুলিতে শহীদ হন)।

 

শহীদ ড. শামসুজ্জোহার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায়, পয়লা মে ১৯৩৫। গত শতাব্দের পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে তাঁদের পরিবার পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে অনার্সসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিলাভের পর লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ সায়েন্স থেকে পুনরায় বিএসসি ডিগ্রি নেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে। এরপর ১৯৬১তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট অফিসার ও পরে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। এখান থেকে পুনরায় তিনি লন্ডন যান এবং ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে ফিরে এসে রাজশাহীতে রিডার বা সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ দেন।

 

ডক্টর জোহা শুধু একজন মেধাবী ও ছাত্রবান্ধব শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই দেশপ্রেমিক এবং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সাহসী সৈনিক। তবে ইতিহাসবিমুখ এই জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য, তাদের মনটা যেমন বড়ই ভুলো, তেমনি স্মৃতির দর্পণেও জমে থাকে অনেক ধুলো। আজ সকালে রাজশাহী বেতারকেন্দ্রসহ স্থানীয় গণমাধ্যমে জোহা দিবসের খবরটি গুরুত্ব পেলেও ঢাকা থেকে প্রচারিত খবর কিংবা সকালে হাতে পাওয়া একটি জাতীয় দৈনিকে শিক্ষক দিবস অথবা শহীদ জোহার নামের কোনো উল্লেখ ছিল না।।

 

লেখক: বাংলাদেশ বেতারের অবসরপ্রাপ্ত সংবাদকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*