Home » উত্তরের খবর » দেশে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইয়ের বংশ বিস্তারের আশা
দেশে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইয়ের বংশ বিস্তারের আশা

দেশে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইয়ের বংশ বিস্তারের আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রায় নীলগাইয়ের বংশ বিস্তারের আশা দেখছে বন বিভাগ। গত মঙ্গলবার নওগাঁর মান্দা থেকে উদ্ধার করা পুরুষ প্রজাতির একটি নীলগাই রাজশাহী বন্যপ্রাণী ও পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল থেকে নারী প্রজাতির একটি নীলগাই উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে দিনাজপুর রামসাগর জাতীয় উদ্যানে রাখা হয়েছে। মান্দা থেকে উদ্ধার করা নীলগাইটিও পাঠানো হবে সেখানে। বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রায় এই প্রাণীর সংখ্যা এখন দু’টিতে দাঁড়ালো। দুটি নীলগাই-ই প্রাপ্ত বয়স্ক। ফলে তাদের একসাথে রাখা হলে স্বাভাবিক নিয়মেই বংশবিস্তার করবে- এমন আশা করে বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিলুপ্ত প্রায় এই বণ্যপ্রাণীটির সংখ্যা আবারও বাড়ানো যাবে বলে আমরা মনে করছি।

তবে মান্দা থেকে উদ্ধার হওয়া বিলুপ্ত প্রায় নীল গাইটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে রাজশাহী বন বিভাগ। লোকালয়ে ঢুকে আতঙ্কিত হয়ে পড়াা নীলগাইটি কিছুই খাচ্ছে না। বুধবার সকাল থেকে তাকে পাকা কলা, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু খাচ্ছে না তেমন কিছুই। তাকে সুস্থ করে তুলতে বৃহস্পতিবার অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশ কয়েকটি ওষুধও প্রয়োগ করা হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, ২/৩ দিনের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে নীলগাইটি।

নওগাঁর মান্দা উপজেলা থেকে উদ্ধার করা বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইটিকে বুধবার রাতে রাজশাহী বন্যপ্রণী ও পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। এখন সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। পরিচর্যা কেন্দ্রের ভেতরের প্রাকৃতিক পরিবেশেই তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

রাজশাহী নগরীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. ফরহাদ উদ্দিন বুধবার রাতে নীলগাইটি দেখে এসেছেন। তার সহযোগিতায় নীলগাইটিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পরিচর্যা কেন্দ্রের ভেতরে নেয়া হয়। তার অধীনেই চিকিৎসা চলছে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইটির।

ভেটেরিনারি সার্জন ডা. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, উদ্ধারের সময় পায়ে ও পেটে রানের কাছে আঘাত পেয়েছিল নীলগাইটি। ফলে ওই স্থানগুলোতে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে যেন কোনো ইনফেকশন ছড়াতে না পারে সেজন্য বৃহস্পতিবার অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশ কয়েকটি ওষুধ তার শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে উদ্ধার হওয়া নীলাগাইটি। এর মধ্যে মানুষ নিয়ে তার ভেতরের আতঙ্ক কেটে গেলে ঠিকমত খাওয়া-দাওয়াও শুরু করবে নীলগাইটি।

রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, নীলগাই বণ্যপ্রাণী। লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এমনিতেই প্রাণীটি ঘাবড়ে গেছে। এর ওপর তাকে ধরতে গ্রামের মানুষের প্রাণপন চেষ্টা, চিৎকার, হৈ-হুল্লোড়ে প্রাণীটি আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে বৃহস্পতিবার তেমন কোনো খাবারই মুখে তোলেনি প্রাণীটি। চিকিৎসকের পরামর্শে নীলগাইটিকে পাকা কলা, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি দেয়া হয়েছে। নীলগাই তৃণভোজী প্রাণী। সাধারণত এগুলোই তার খাবার।

সুস্থ হওয়ার পর নীলগাইটিকে কোথায় নেয়া হবে জানতে চাইলে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বিষয়টি ঢাকায় জানানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসার পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে নীলগাইটিকে দিনাজপুর রামসাগর জাতীয় উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হবে। কারণ সেখানে ইতোমধ্যে আরও একটি নীলগাই রয়েছে। সেটি নারী। আর মান্দা থেকে উদ্ধার হওয়া নীলগাইটি হচ্ছে পুরুষ। তাই তাদের এক সাথে রাখা হবে।

রাজশাহী থেকে নীলগাইটি দিনাজপুরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর  ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল থেকে একটি নীলগাই উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে দিনাজপুর রামসাগর জাতীয় উদ্যানে রাখা হয়েছে। এবার মান্দায় আরও একটি নীলগাই উদ্ধার হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রাণীটি বিরল। বিলুপ্ত প্রায় এই প্রাণীর সংখ্যা বাংলাদেশে এখন দু’টিতে দাঁড়ালো। আগের উদ্ধার হওয়া নীলগাইটি নারী। আর সৌভাগ্যক্রমে এবারের প্রাণীটি পুরুষ। এরা দুজনই প্রাপ্ত বয়স্ক। তাই তাদের একসাথে রাখা হলে স্বাভাবিক নিয়মেই বংশ বিস্তার করবে। ফলে বিলুপ্ত প্রায় এই বণ্যপ্রাণীটির সংখ্যা আবারও বাড়ানো যাবে বলে আমরা আশা করছি। আগামী এক সপ্তাহ রাজশাহীতে নীলগাইটির চিকিৎসা চলবে। এর পরই তাকে দিনাজপুর নেয়া হবে।

এর আগে গত মঙ্গলবার সকালে নওগাঁর মান্দা উপজেলার জোত বাজার এলাকা থেকে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাইটিকে আটক করে এলাকাবাসী। বাজার এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ছোটাছুটি করছিলো প্রাণীটি। দেখতে পেয়ে গ্রামের শতাধিক বাসিন্দা ধাওয়া করে সেটি আটক করে বেঁধে রেখে পুলিশ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাকে খবর দেয়। পরে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয় এবং রাজশাহী বন্যপ্রাণী ও পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হয়।

এদিকে নীলগাই সর্ম্পকে ইন্টারনেট ঘেটে জানা গেছে, নীলগাই ভারতীয় উপমহাদেশে অ্যান্টিলোপ জাতীয় প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বৃহদাকৃতির প্রাণী। ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলেই নীলগাই দেখা যায়। ১৯৫০ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে নীলগাই দেখা গেলেও বর্তমানে তা প্রায় বিলুপ্ত। নীলগাই এমনিতে সুন্দর, তবে দেখতে অনেকটা বিদঘুটে চেহারার ঘোড়ার মতো। দেহের পেছনের দিক কাঁধ থেকে নীচু। কারণ, সামনের পা পেছনের পা থেকে লম্বা। ঘাড়ে বন্য শূকরের কেশরের মত ঘন লোম থাকে। মর্দা নীলগাইয়ের গায়ের রঙ গাঢ় ধূসর, প্রায় কালচে রঙের। অনেক সময় গায়ে নীলচে আভা দেখা যায় বলে এদের নীলগাই বলা হয়। অন্যদিকে, নারী নীলগাই ও শাবকের গায়ের রঙলালচে বাদামী। কিন্তু খুরের ওপরের লোম সাদা এবং প্রত্যেক গালে, চোখের নিচে ও পেছনে দুটি সাদা ছোপ থাকে। ঠোঁট, থুতনি, কানের ভেতরের দিক ও লেজের নিচের তলদেশ সাদাটে।পুরুষ নীলগাইয়ের শুধু শিং হয়। নারীর হয় না। নীলগাই ছোট ছোট পাহাড় আর ঝোপ-জঙ্গলপূর্ণ মাঠে চড়ে বেড়াতে ভালবাসে। তবে তারা ঘন বন এড়িয়ে চলে।

বাংলার কথা/জানুয়ারি ২৬, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*