Home » ইতিহাস-ঐতিহ্য » বঙ্গবন্ধু যেভাবে ফিরে এসেছিলেন
বঙ্গবন্ধু যেভাবে ফিরে এসেছিলেন

বঙ্গবন্ধু যেভাবে ফিরে এসেছিলেন

সাইদ রহমান ০

কিছু প্রত্যাবর্তন নিছক ফিরে আসা নয়, ইতিহাসের এক অসামান্য বাঁকবদল, এক নতুন অভিযাত্রা। ১৯৭২ সালের এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এমনই। দুপুর ১ টা ৪১ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামার পর আড়াই ঘণ্টার জনসমুদ্র সাঁতরে রাজনীতির কবি যখন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের গণসূর্যের মঞ্চে পা রাখলেন, তখন আবেগে ঝঙ্কৃত হলো গোটা জাতি। সে এক অসাধারণ মাহেন্দ্রক্ষণ, যেখান থেকে শুরু হলো একটা দেশের মহত্তম গৌরচন্দ্রিকা। এ কারণে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ছিল বাঙালির জন্য পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা অর্জনের দিন।

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি- ২৯০ দিনের বিভীষিকা শেষে লন্ডন-দিল্লি হয়ে স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধু। এর আগে পাকিস্তানের কারাগারে গোপনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল দেশটির সামরিক জান্তা। অন্যদিকে এই ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের সরকার প্রধানকে চিঠি দেন। ফলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি।
৮ জানুয়ারি ভোরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি সামরিক বিমানে খুব গোপনে তাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের  হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।’ প্লেনটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ক্যারিজেস হোটেলে নিয়ে আসা হয় তাকে। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালি হোটেল ঘিরে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে লন্ডনের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।

 

দুপুরের দিকে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য আমি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি, আমি জানতাম ওরা আমাকে হত্যা করবে। আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব না, কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে।’

 

বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ তখন ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না এলেন।
৮ জানুয়ারি রাতে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বীকৃতির বিষয়টি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় তার জীবন রক্ষার প্রচেষ্টার জন্য বঙ্গবন্ধু এডওয়ার্ড হিথকে ধন্যবাদ জানান।

 

৯ জানুয়ারি সকালে লন্ডনে বসেই টেলিফোনে ইন্দিরা গান্ধী-বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আধাঘণ্টা আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানান শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং অনুরোধ করলেন, ঢাকার পথে যেন তিনি দিল্লিতে যাত্রা বিরতি করেন। বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই দিল্লির উদ্দেশে রওনা হলেন।
দিল্লির ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার বিবরণ অনুযায়ী, ‘প্রায় কালো ধূসর ওভারকোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নামলেন। প্রেসিডেন্ট ভি. ভি. গিরি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করলেন, পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী স্বাগত জানাচ্ছিলেন তখন ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানানো হয়। শুভেচ্ছা বিনিময় পর্ব শেষ হলে বঙ্গবন্ধু তিন বাহিনীর ১৫০ সদস্যের গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন এবং পরে ভিআইপি প্যান্ডেলে যান যেখানে তার ওপর গাঁদাফুলের পাপড়ি বর্ষণ করা হয়।

 

নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানোর পর প্রেসিডেন্ট ভি.ভি. গিরি বলেন, ‘মহোদয়, এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দেশের প্রধান হিসেবে আপনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এই অঞ্চলে স্থায়ী ও অটুট শান্তি প্রতিষ্ঠার, প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা জোরদার এবং সুনিশ্চিত করবে।’ জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার জন্য এই ক্ষণ অত্যন্ত আনন্দের। বাংলাদেশে ফেরার পথে আমি আপনাদের মহান দেশের এই ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ, আপনাদের মহিমান্বিত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন এই সরকার ও ভারতের জনগণ যারা আমার জনগণের উত্তম বন্ধু তাদের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এটি হলো আমার ন্যূনতম করণীয়।

 

পরদিন ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রাণের শহর ঢাকা ফিরে আসেন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে। আগে থেকেই বাংলাদেশ বেতারে ধারাবিবরণী দেওয়া হচ্ছিল। বিমানবন্দর ও রাস্তার দুপাশে তখন অপেক্ষমাণ লাখো জনতা। সবার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ অবতরণের আগে কমেট বিমানটি বঙ্গবন্ধুর অভিলাষের প্রতি শ্রদ্ধাবশত প্রায় ৪৫ মিনিট বিমানবন্দরের ওপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। উপর থেকে ‘সোনার বাংলা’কে অবলোকন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

 

মাটিতে পা দিয়েই আবেগে কেঁদে ফেলেন বঙ্গবন্ধু। বিমানবন্দরে অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী সব বাঙালি অশ্রুসজল নয়নে বরণ করেন ইতিহাসের বরপুত্রকে। অস্বাভাবিক ভিড়ের কারণে বিমানবন্দর থেকে একটি খোলা গাড়িতে করে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাতে লেগে গেল দীর্ঘ সময়।
বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ৩৫ মিনিট জাতির উদ্দেশে দিক-নির্দেশনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্র কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকিস্তানের পক্ষে যারা দালালি ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ; মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা ছিল তাঁর ভাষণে। তিনি ডাক দিলেন দেশ গড়ার সংগ্রামে।

 

রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত মন্ত্রমুগ্ধ জনতা দুহাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ভাষণে কান্নারত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি। আজ তোমার সেই আক্ষেপ মিথ্যা প্রমাণিত করে সাত কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে।’

 

সূত্র: খোলা কাগজ/বাংলার কথা/জানুয়ারি ১০, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*