Home » জাতীয় খবর » নির্বাচনী ডিগবাজি
নির্বাচনী ডিগবাজি

নির্বাচনী ডিগবাজি

বাংলার কথা ডেস্ক ০

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের মধ্যে বেশকিছু নেতা ইতিপূর্বে অন্য দলের নেতা হিসেবে ভিন্ন প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। এসব নেতার অধিকাংশই এসেছেন দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেশের রাজনীতিতে পরিচিত আওয়ামী লীগ থেকে। এর বিপরীত ঘটনাও আছে।

 

বিএনপি থেকে তো বটেই, জাতীয় পার্টি থেকেও বিভিন্ন নির্বাচনের মৌসুমে অনেক নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে সচরাচর ডিগবাজি-সফল নেতার খবর পৌঁছে গণমাধ্যমের সুবাদে। তবে ডিগবাজির ইচ্ছা প্রকাশের পর প্রত্যাখ্যাত হওয়া নেতাদের সংখ্যাও কম নয়। এ দেশের রাজনীতিতে এ সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়।

 

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মতো বড় দলে বিভিন্ন সময় নানা মোড় নিয়েছে। দল ভেঙে বেরিয়ে এসে পাল্টা দল গঠন, এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে অসংখ্য।

 

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিগবাজির জন্য সবচেয়ে আলোচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৯৭৭-৭৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। শুরুতে এরশাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারের তথ্যমন্ত্রী এবং ১৯৮৬ সালে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ব্যারিস্টার মওদুদ। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও ডিগবাজি দিয়ে বিএনপিতে ফিরে যান মওদুদ। তার পর থেকে এখনো বিএনপির সঙ্গেই আছেন তিনি।

 

ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও বর্ণাঢ্য। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ড. কামাল হোসেন। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর ১৯৮১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীও হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট তিনি দল থেকে বেরিয়ে যান, গঠন করেন গণফোরাম। ২০০৭ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি কয়েকটি ছোট ছোট দল নিয়ে গঠন করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সে দফায় ঐক্যফ্রন্ট সফলতার মুখ দেখেনি। এর পর দশম সংসদ নির্বাচন পেরিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর তিনি একটি জোট গঠন করেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নামে।

 

এবারের নির্বাচনে ড. কামাল নিজে প্রার্থী না হলেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যেসব প্রার্থী নির্বাচন করবেন, ওই জোটের শীর্ষ নেতৃত্বে কিন্তু প্রবীণ এই আইনজীবীই আছেন। প্রসঙ্গত, আদালতের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শিবির থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নামছেন।

 

গণফোরামের ব্যানারে ধানের শীষ নিয়ে পাবনা থেকে এবার নির্বাচন করবেন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে সাড়া না পাওয়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। তিনি একসময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া মাহমুদুর রহমান মান্না, মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদসহ আওয়ামী লীগের সাবেক অনেক নেতা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। এ তালিকার সর্বশেষ নাম গোলাম মাওলা রনি। পটুয়াখালী-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এই সাবেক সাংসদই শুধু নন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে খুন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়াও আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়বেন।

 

এদের মধ্যে ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন মোস্তফা মহসিন মন্টু, ছিলেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। তিনি ড. কামালের সঙ্গে গণফোরামে আছেন।

 

অন্যদিকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপির একাধিক সাবেক প্রভাবশালী নেতা। বিএনপির একসময়ের মহাসচিব এবং পরবর্তীকালে তাদের সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী বদরুদ্দোজা চৌধুরী দল থেকে বেরিয়ে গড়েছেন নতুন দল বিকল্পধারা। এ দলটি আগের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়াই করলেও এবার এর প্রধান প্রতিপক্ষের নৌকা প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন।

 

বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও বেশ কিছু আইনি জটিলতায় চূড়ান্ত সাড়া পাননি। শুধু বিকল্পধারার নেতারা কিংবা নাজমুল হুদাই নন, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিএনপির অনেকেই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করার জন্য যোগাযোগ করছেন। কৌশলগত কারণে তাদের নাম বলেননি তিনি।

 

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির একঝাঁক এমপি আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। তৎকালে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম একটি রাষ্ট্রের দূতাবাসের মাধ্যমে পাওয়া একটি তালিকায় বিএনপি থেকে সাংসদ হওয়া ২১ নেতার নাম ছিল, যারা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। নানাবিধ কারণে তখন তাদের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি।

 

বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া ওই তালিকার নামগুলো হচ্ছে সৈয়দ শহীদুল হক জামাল, আব্দুল করিম আব্বাসী, আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমান, রেজাউল বারি ডিনা, রুস্তম আলী ফরায়জী, কক্সবাজারের মো. শহীদুজ্জামান, মেহেরপুরের আবদুল গণি, কিশোরগঞ্জের সুরঞ্জন ঘোষ, পাবনার কেএম আনোয়ারুল ইসলাম, নোয়াখালীর ড. ফজলুল কবির, খুলনার ড. গাজীউল হক, সুনামগঞ্জের নজির হোসেন, মৌলভীবাজারের এমএম শাহীন, বগুড়ার ড. জিয়াউল হক, ঝালকাঠির ইলেন ভুট্টো, ময়মনসিংহের দেলোয়ার খান দুলু, এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, মেহেরপুরের সাবেক মেয়র মোতাসির বিল্লাহ মধু, বরগুনার নুরুল ইসলাম মনি ও চাঁদপুরের হুমায়ুন কবির বেপারী।

 

রাজনৈতিক নেতাদের এই ডিগবাজি সংস্কৃতির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে প্রথম সামরিক শাসকের আমলে এটা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলোকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভাঙা-গড়ার চল শুরু হয়। এর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দেশের রাজনীতির কাঠামোয় নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। নির্বাচনী রাজনীতিতে বৃদ্ধি পায় সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীদের দৃশ্যমান তৎপরতা। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে একের পর এক ডিগবাজি প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা এখনো অব্যাহত।

 

সূত্র: আমাদের সময়/বাংলার কথা/নভেম্বর ৩০, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*