Home » উত্তরের খবর » সবিতা চক্রবর্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার এখন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চার আধার
সবিতা চক্রবর্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার এখন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চার আধার

সবিতা চক্রবর্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার এখন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চার আধার

সোহেল রানা জয়, নওগাঁ  

নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার ঐতিহ্যবাহি বালুভরা আর বি উচ্চ বিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারটি একদিকে বিদ্যালয়ের খ্যতি যেমন বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরনের সুযোগ প্রসারিত করেছে। ১০৪ বছর বয়সের প্রাচীন এই বিদ্যালয়টি এলাকার শিক্ষা বিস্তারের  ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভৃমিকা রেখে চলেছে।

 

এ বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ন পদে থেকে জাতির নিরবচ্ছিন্ন সেবা করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি নিজ বিদ্যালয়টির উন্নয়ন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন।

 

তাঁদেরই একজন সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমানে তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে তাই নয়, এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মান ও সংস্কার, ব্রীজ কার্লভার্ট নির্মান ইত্যাদি কাজও সম্পাদন করেছেন। এর মধ্যে বালুভরা গ্রামে ছোট যমুনা নদীর উপর সামান্য দূরত্বের মাঝে দুই দুইটি ব্রীজ নির্মান করেছেন। তাঁর উদ্যোগে এই এলাকার জনগণ অনেক আগেই বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছেন।

 

একজন সরকারি কর্মকর্তাকে নিজ এলাকার উন্নয়নে এমন মনোনিবেশ সহজে লক্ষ্য করা যায় না। এ কারনে তিনি এলাকায় একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় এবং সক্রিয় উদ্যোগে বালুভরা আর বি উচ্চ বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয়েছে সবিতা চক্রবর্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার। কোন মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে এমন সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার কোথাও আছে বলে প্রতীয়মান হয় নি। এই গ্রন্থাগারে তিন হাজার ৭২৬টি বই রয়েছে।

 

বইয়ের তালিকায় রয়েছে স্থানীয়, জাতীয় এবং বিশ্বখ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, শিল্পী সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্র শিল্পী, ইতিহাসবিদদের জীবনী, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন লেখা, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক নোভেল, কাব্যগ্রন্থ, রবীন্দ্র রচনাবলী, নজরুল রচনাবলী, ধর্মীয় গ্রন্থ সামগ্রী, গবেষনামুলক লেখা, শিশুতোষ লেখাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যম এই গ্রন্থাগারটিকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

 

গ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মাসুদা আক্তার জানান, ছাত্রছাত্রীদের গ্রন্থাগারে এসে বই পড়ার আগ্রহ বেশ। সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন একটি করে পাঁচটি ক্লাশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ক্লাশ রুটিনে। রুটিন মাফিক ক্লাশে এসে তারা তাদের চাহিদামত বই নিয়ে পড়াশুনা করতে পারে। এখানে বই পড়া শেষে পুনরায় বইটি ফেরত দিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বই এবং শিশুতোষ বই পড়তে বেশী আগ্রহী বলে মনে হয়।

 

এই গ্রন্থাগারের উল্লেখযোগ্য এবং বিরল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের ছবি টানিয়ে রাখা। সংগৃহিত বইগুলোর মতোই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের শিক্ষা, সাংস্কৃতি, সাহিত্য, ক্রীড়া, রাজনীতি, শিল্পী, দার্শনিক, চলচ্চিত্র শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, ঔপন্যাশিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়কদের দুষ্প্রাপ্য সব ছবি এখানে চারিদিকের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে টানানো রয়েছে। এসব ছবির মধ্যে বঙ্গবন্ধু থেকে মাওসেতুং, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে সেক্সপিয়ার, হাছনরাজা থেকে লালন ফকির, কোনটাই বাদ পড়ে নি। দুষ্প্রাপ্য এই কালেকশন সত্যিই যে কোন মানুষকে অভিভুত করে। ছবির এই গ্যালারীতে মোট তিন শতাধিক ছবি ঠাঁই পেয়েছে।ছবির তালিকা আরও বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান গ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মাসুদা আক্তার।

 

এই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেনীর ছাত্র প্রীতম কুমার চক্রবর্তী ও ৬ষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্রী যুথি আক্তার তারা দুজনেই এই লাইব্রেরীর নিয়মিত পাঠক। তারা বেশীর ভাগ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ে থাকে। তারা বলেন, এই গ্রন্থাগারে বই পড়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সঠিক এবং বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি।

 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মোত্তালেব হোসেন বলেন, বালুভরা আর বি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন থেকে শুরু করে সবদিকে তাঁর গঠনমুলক ভূমিকা অতুলনীয়। একমাত্র তাঁরই নজরদারী এবং উদ্যোগে এই বিদ্যালয়টি একটি আদর্শ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এরকম একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি নিজেকে গর্বিত বোধ করছি।

 

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সুকমল কর্মকার বলেন, বিদ্যালয়ের লাইব্রেরীটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি লাইব্রেরী এলাকার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে যথেষ্ঠ সহায়ক। কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে জ্ঞানী করে না। জ্ঞান অর্জনে বই পড়ার কোন বিকল্প নাই। বালুভরা আর বি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ন সচিব বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নসহ লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমি তাঁকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

প্রাক্তন ছাত্র সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যন ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, আমার পূর্বপুরুষ থেকেই এলাকার মানুষের কল্যানমুখী কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। আমার দাদু বালুভরা আর বি উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তারও আগে বর্তমান জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরে অনুরুপ আরেকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে আমার কিছু করার সুযোগ বা সাধ্য রয়েছে, সেখানে কিছু করতে পারা গর্বের ব্যাপার। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে সুযোগ ও যোগ্যতা দিয়েছেন, তার দায়বদ্ধতা থেকেই এলাকা এবং এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে পারা গৌরবের মনে করি। সেই চেতনা বোধ থেকেই আমি আমার গ্রাম, আমার এলাকা এবং আমার স্কুলের জন্য এসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

 

বাংলার কথা/নভেম্বর ২৭, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*