Home » জাতীয় খবর » ফেসবুক টুইটারে আসক্তি ‘ভয়ঙ্কর’
ফেসবুক টুইটারে আসক্তি ‘ভয়ঙ্কর’

ফেসবুক টুইটারে আসক্তি ‘ভয়ঙ্কর’

বাংলার কথা ডেস্ক ০

‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি/ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে/ঘুচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি/ভেবে দেখেছো কি তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে তারও দূরে তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…’ গত শতকের সত্তর দশকে কলকাতার বিখ্যাত ব্যান্ড মহীনের ঘোড়াগুলোর জনপ্রিয় গানের কয়েকটি লাইন এগুলো। আধুনিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ টেলিভিশন মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা যে বাড়িয়েই চলছিল তারই আর্তি এ গান।

 

৫০ বছর পর ইন্টারনেটের বদৌলতে সারা দুনিয়ায় যোগাযোগ আজ আরও অকল্পনীয় গতিতে বেড়েছে। আজকের বিশ্বে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ হচ্ছে নিমিষের চেয়ে ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যে। তথ্যপ্রযুক্তির এ উন্নয়নের ওপর ভর করে মানবসভ্যতা প্রবেশ করছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে। আর সেটা সম্ভব করে তুলছে ফেসবুক, টুইটার, ইমোর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

 

তবে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভ্যস্ততার কুফল এরই মধ্যে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মানুষ। দিনে দিনে এর আসক্তি হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। বিশেষ করে শিশু ও টিনএজারদের মানসিক বিকাশে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে আরোপ করা হচ্ছে বিধিনিষেধ। ব্যবহারও কমছে কোথাও কোথাও। তবে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে ভয়ঙ্করভাবে আসক্তি বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

 

‘উই আর সোশ্যাল’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বের সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে ৩৭৭ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ২৭৮ কোটি ব্যবহারকারী কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভ্যস্ত।

 

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ৯৯ শতাংশই ফেসবুক ব্যবহার করেন। আর এ সংখ্যা আড়াই কোটির মতো। যাদের মধ্যে ২ কোটি ২৬ লাখ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন।

 

ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে এগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে একজন মানুষ আরেকজনের যোগাযোগের আওতায় চলে আসছেন। যেটিকে বন্ধুত্ব বলছেন এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। যেমন ফেসবুকের মাধ্যমে একই সঙ্গে ৫ হাজার মানুষের সঙ্গে বন্ধু হতে পারছেন যে কোনো ব্যবহারকারী। কিন্তু ভার্চুয়াল এ বন্ধুত্ব অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত যে আচরণ এবং প্রথাগত যোগাযোগ ও ভাববিনিময়ের যে বৈশিষ্ট্য সেটাকেই হুমকির মুখে ফেলছে।

 

এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরে বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো নিত্যনতুন এমন সব ফিচার যুক্ত করছে, যাতে এগুলোর সঙ্গে মানুষ আরও বেশি সময় যুক্ত থাকে। এসব ফিচার মানুষের মস্তিষ্কে এমন সব প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, যার ফলে খুব বেশি সময় ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সে বেশি সময় দূরে থাকতে পারছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ আসক্তি মনোদৈহিক নানা জটিলতা সৃষ্টি করছে। যার বেশিরভাগই মানসিক।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নেতিবাচক দিক নিয়ে বিশ্বে গবেষণা হচ্ছে বিস্তর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপও নানা সময়ে জানাচ্ছে এর নেতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে। যুক্তরাজ্যের রয়াল সোসাইটি ফর পাবলিক হেলথের সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনলাইন হয়রানি বা সাইবার বুলিং, তথ্য চুরি, বাজে ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মতো ঘটনা তরুণদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 

ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সন্তানদের নৈতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলোর অতি ব্যবহার নিয়ে তাই অভিভাবকরা চিন্তিত।

 

যে একাকিত্ব এড়াতে মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, উল্টো সেখানে মানুষ বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়ের ক্যাসলস। তার মতে, নেটওয়ার্কের কারণে আমরা একটা ভার্চুয়াল জগতে বাস করছি। ধীরে ধীরে যা হচ্ছে, তা হলো নেট বনাম ব্যক্তি জীবন। মানুষ সমাজে একা হয়ে যাচ্ছে।

 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পারিবারিক বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে। এ সম্পর্ক যেন ফেসবুকে স্থানান্তর হচ্ছে। এখন এখন ছাদের নিচে থেকেও মা-বাবা, ছেলেমেয়ের সঙ্গে শারীরিক যোগাযোগ ঘটছে না। যোগাযোগটা হচ্ছে ফেসবুকে লাইক, স্যাড, হাসি বা অন্য কোনো ইমোজির মাধ্যমে। কিংবা স্ট্যাটাস, ছবির নিচে কমেন্ট করে। তারা মনে করছেন, আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেত। গল্পগুজব করত। এখন প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ফোন। পাশাপাশি বসেও কারও সঙ্গে কারও কথা নেই। সারা দিন কাজ বা ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে যে যার ফোন বা নেট নিয়ে ব্যস্ত। ভার্চুয়াল জগতেই সবটা জগৎ, ফলে বাস্তব জীবনের সামাজিকতা কমে যাচ্ছে।

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির ফলে মানুষের আবেগ-অনুভূতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, হতাশা ও দুশ্চিন্তা পেয়ে বসে। অনেক ক্ষেত্রে একাকিত্বে ভোগে ও নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করে, কাজের সময় ঠিকঠাক থাকে না, কাজের প্রতি আগ্রহও হারিয়ে ফেলে, ঈর্ষাবোধ ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক সব দায়-দায়িত্ব ভুলে আসক্তের মনোযোগ ডুবে থাকে ফেসবুকে।

 

বর্তমান সময়ে দাম্পত্য কলহ বাড়া ও বিবাহ বিচ্ছেদ মহামারী আকারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কম্পিউটার ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার নামে একটি সাময়িকীর এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ‘ফেসবুক, টুইটার বা এ রকম মাধ্যমগুলোতে বেশি সময় দেওয়া মানুষরা দাম্পত্যজীবনে অসুখী হতে পারেন, এমনকি বিয়ে-বিচ্ছেদের কথাও ভাবতে পারেন।’

 

সূত্র: খোলা কাগজ/বাংলার কথা/অক্টোবর ২৬, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*