Home » উত্তরের খবর » রাজশাহী-১ আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি
রাজশাহী-১ আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি

রাজশাহী-১ আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনটি জাতীয় সংসদের ৫২ নম্বর আসন। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি বড় দলের মনোনীত প্রার্থীরাই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এখান থেকে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান। তার ভাগ্নে রাজশাহী জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ ওমর ফারুক চৌধুরী বর্তমানে এই আসনের সংসদ সদস্য। প্রথম ও সর্বশেষ সংসদে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যরা এই আসনে প্রতিনিধিত্ব করলেও নানা কারণে এখন এখানে শক্ত অবস্থান বিএনপির। উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে জামায়াতে ইসলামীরও। একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আওয়ামীলীগ। আসছে একাদশ সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলে সেক্ষেত্রে এই আসনে বিএনপিকেই এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় ভোটাররা।

স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮৬ সালের আগ পর্যন্ত রাজশাহী-১ আসনটি ছিল আওয়ামীলীগের ঘাঁটি। প্রথম জাতীয় সংসদের মতো দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটি ছিল আওয়ামীলীগের দখলে। ১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে এমপি নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামীলীগের প্রয়াত সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মোহসীন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের তৃতীয় নির্বাচনে আসনটি চলে যায় জামায়াতে ইসলামীর কব্জায়। সেবার এমপি নির্বাচিত হন জামায়াত নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, যিনি বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত আমীর। এরপর ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ৪র্থ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মুক্তিযোদ্ধা মোঃ দুরুল হুদা এমপি নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৯১ সাল থেকে পাল্টে যায় এখানকার রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যারিস্টার মোঃ আমিনুল হক বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঠাঁই পান খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভায়। সে সময় তার নেতৃত্বে গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার প্রতিটি এলাকায় লাগে উন্নয়নের ছোঁয়া। বিদ্যুৎ, ব্রীজ-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে তার আমলে। এ ছাড়া তিনি সেসময় এলাকার বেকার যুবকদের পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেন। এ কারণে বিএনপি ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি।

অনুন্নত দুই উপজেলাকে উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে দিয়ে ব্যারিস্টার আমিনুল হক রাজশাহী-১ আসনকে পরিণত করেন বিএনপির ঘাঁটিতে। ফলে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত একটানা এমপি নির্বাচিত হন তিনি। খালেদা জিয়ার সরকারের দুই মেয়াদেই তিনি প্রথমে প্রতিমন্ত্রী এবং পরে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন একাধিক মন্ত্রণালয়ে। ভোটারদের মতে, ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেলে এ আসনে ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়াবেন। কারণ তার আমলে রাস্তাঘাটের যে উন্নয়ন হয়েছে, তার উপর ভর করেই এখনও পথ চলছে গোদাগাড়ী-তানোরবাসী।

ওয়ান ইলেভেনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ১৯টি মামলা হলে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন করায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি ব্যারিস্টার আমিনুল হক। ওই নির্বাচনে তার বড় ভাই পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক (আইজি) মোঃ এনামুল হককে দলীয় মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তাকে ১৭ হাজার ৩৩৬ ভোটে হারিয়ে সাংসদ হন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। ১০ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জন করায় সংসদে যেতে তাঁকে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে হয়নি। তবে এবার তাঁর বিরুদ্ধে এককাট্টা দলের সাত নেতা। স্থানীয়ভাবে ‘সেভেন স্টার’ নামে পরিচিত এই নেতাদের দাবি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসনে আওয়ামীলীগকে জিততে হলে তাঁদের যেকোনো একজনকে মনোনয়ন দিতে হবে।

 

আওয়ামী লীগের প্রথম দফার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হন ওমর ফারুক চৌধুরী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হওয়ার পর দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। এরই ফল সেভেন স্টার। গত বছরের ১৮ নভেম্বর গোদাগাড়ীর কাঁকনহাটে প্রথম সমাবেশ করেন এই সাত নেতা। সেখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাত নেতার নাম ঘোষণা করা হয়। তাঁরা হলেন তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুন্ডুমালা পৌর মেয়র গোলাম রাব্বানী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বদরুজ্জামান ও মকবুল হোসেন খান, আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য আতাউর রহমান খান, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মতিউর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাবু এবং জেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি আবদুল ওহাব।

এই সাত নেতা বলছেন, তাদের ভেতর থেকে যেকোনো একজনকে দলীয় মনোনয়ন দিলে তারা একজোট হয়ে কাজ করে নৌকার জয় ছিনিয়ে আনবেন। কিন্তু ওমর ফারুক চৌধুরীর মনোনয়ন তারা মানবেন না। তাদের অভিযোগ, এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের প্রাধান্য দেন। এ নিয়ে দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীর রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। তার বিরুদ্ধে সরকারের নানা প্রকল্প ছাড়াও খাসপুকুর লিজ ও বিএমডিএ’র গভীর নলকূপে অপারেটর নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বিস্তর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশ প্রহরী কাম দপ্তরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিয়োগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন দলের নেতাকর্মীরা।

দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী মতিউর রহমানের দাবি, ওমর ফারুক চৌধুরী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। মাদকের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সরকারি তালিকাতেই উঠে এসেছে। এসব কারণে তিনি গণবিচ্ছিন্ন।

তানোর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মুন্ডুমালা পৌর মেয়র গোলাম রাব্বানী কর্মী-সমর্থকদের সাথে নিয়ে দুই উপজেলাতেই গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গোদাগাড়ীতে তার গণসংযোগের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এজন্য তিনি দায়ি করেছেন এমপির মদদপুষ্টদের।

নিজ দলের নেতাদের অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, জেলা সভাপতি হিসাবে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। তাঁর দায়িত্ব তিনি পালন করে যাচ্ছেন। নেত্রী মনে করলে তাঁকে মনোনয়ন দেবেন, না মনে করলে দেবেন না। অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি কখনো বেআইনি তদবির করেন না, এটা প্রশাসনের সবাই জানে।

তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভা নিয়ে রাজশাহী-১ আসন গঠিত। এখানকার বিএনপিতে আওয়ামীলীগের মতো গৃহবিবাদ নেই, আছে জামায়াত-ভীতি। স্থানীয় বিএনপি মনে করে, দলীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী মোঃ আমিনুল হকের বিকল্প নেই। তিনি ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত সচিব জহুরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক যুববিষয়ক সম্পাদক সাজেদুর রহমান খান মার্কনি এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির যুগ্মসম্পাদক অধ্যাপক সাহাদৎ হোসেন শাহিন মনোনয়ন প্রত্যাশায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।  এ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে জয়ী জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ২০ দলীয় জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য রাজশাহী-১ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ জন। এর মধ্যে গোদাগাড়ীতে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০০ এবং তানোরে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫০ জন। গোদাগাড়ী উপজেলার মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭ ও মহিলা ১ লাখ ১৮ হাজার ৩২৩ জন। তানোর উপজেলার ভোটারদের মধ্যে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫১ জন পুরুষ ও ৭৪ হাজার ৪৯৯ জন মহিলা। আসছে নির্বাচনের জন্য এ আসনে ভোট কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৫টি। এর মধ্যে গোদাগাড়ীতে ৯৪টি ও তানোরে ৫১টি।

বাংলার কথা/অক্টোবর ১০, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*