Home » উত্তরের খবর » বড়পুকুরিয়ার কয়লা গায়েব আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
বড়পুকুরিয়ার কয়লা গায়েব আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

বড়পুকুরিয়ার কয়লা গায়েব আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

তিতাস আলম ০

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা গায়েবের ঘটনায় বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৯ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করা হলেও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কমপক্ষে ২৫ জন এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। খনি এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে খনি ব্যবস্থাপক, শ্রমিক নেতা ও ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ট কেউই মুখ খুলছেন না।

খনি এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই সিন্ডিকেটে রয়েছেন ঠিকাদার, শ্রমিক নেতা, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ২০০ কোটি টাকার কয়লা গায়েব হলে এর কমিশনের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা তাদের পকেটে ঢুকেছে।
স্থানীয় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের মতে, যে পরিমাণ কয়লার ডিও লেটার দেওয়া হতো, তার চেয়ে দ্বিগুণ কয়লা সরবরাহ করা হতো অবৈধভাবে। ১০০ ট্রাকে কয়লা লোড করা হলে নথিভুক্ত হতো ৫০ টি। এভাবেই কয়লা পাচার হতো খনি থেকে। অবৈধভাবে বিক্রি এই কয়লার টাকার ভাগ বসাত স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। অন্যদিকে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নামেও কয়লা পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০০৫ সালে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরুর পর থেকে কখনই সঠিক হিসাব করা হয়নি। চীনা টেকনিশিয়ানদের উৎপাদিত কয়লারই শুধু হিসাব রাখা হয়। এর বাইরে ডাস্ট কয়লা হিসেবে যে ক্ষুদ্রাকৃতির কয়লা পানি নিষ্কাশন করে তোলা ও মজুদ করা হয়, সেগুলোর কোনো হিসাব রাখা হয়নি। অথচ সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে। ওই কয়লা বিক্রির টাকা কখনই নথিতে ওঠেনি। সেই কয়লার হিসাব করা হলে গায়েব হওয়া কয়লার পরিমাণ আড়াই লাখ টনের কম হবে না। টাকার অঙ্কে হিসাব করলে সব মিলিয়ে ৩শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই টাকার ভাগ পেয়েছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।

এদিকে গত কয়েকদিনে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সচিব, পেট্রোবাংলা ও পিডিবির চেয়ারম্যান কয়লা খনি এলাকা ও কোল ইয়ার্ড (কয়লা মজুদ রাখার জায়গা) পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তাদের সবাই জানিয়েছেন, কয়লা খনিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন কয়লা গায়েব হয়েছে। কয়লা দুর্নীতির ঘটনায় যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে, সেখানেও এই পরিমাণ কয়লা চুরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই চুরিটি কীভাবে হলো সে বিষয়ে মুখ খুলছেন না খনির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আনিছুর রহমান। তিনি জানান, এ বিষয়ে মুখ খুলতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ রয়েছে।

“খনি কর্তৃপক্ষ বলেছে যে সিস্টেম লস। কয়লা উন্মুক্তভাবে রেখে দিলে, তখন এর কিছু পরিবর্তন হয়। আপনা আপনি কিছু অংশ পুড়ে যায়। তারপর বৃষ্টিপাতের মধ্যে রাখলে কিছু গুড়া সরে যাবে। তেমনি, খরাতে রাখলে ডাস্ট হয় কিছু উড়ে যাবে। এছাড়া কয়লা উঠানোর সময় কিছু পানি থাকে। প্রথমে ওজন করলে পানির ওজনও আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কয়লা উৎপাদন এবং মজুদ রাখার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস হয়। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ কয়লা না থাকার বিষয়কে সিস্টেম লসে নষ্ট হতে পারে না বলে তারা মনে করেন।

এছাড়া সিস্টেম লস যে হয়েছে, তার কোনো রেকর্ড তারা দেখাতে পারেনি। এখানেই হয়েছে সমস্যা।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বড়পুকুরিয়া খনির চুরি হওয়া কয়লায় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লাভবান হওয়া ব্যবসায়ী, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ঠিকাদার, স্থানীয় ডাস্ট ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সদস্যরা নিজেদের গা বাঁচাতে এখন কয়লা চুরির বিষয়টিকে সিস্টেম লস বলে বিভিন্ন জনের কাছে মন্তব্য করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, খনি থেকে যখন কয়লা ঠিকাদারদের কাছে হাতবদল হতো, তখনই ৫ টনের স্থলে ১৫ থেকে ১৮ টন করে কয়লা বের হতো। ১০ ট্রাক কয়লা খনি থেকে বের হলে নথিভুক্ত হতো ৫ ট্রাক। এ ছাড়া প্রতিবছর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে ১৬ থেকে ২০ হাজার টন কয়লা উত্তোলিত হয়। ৭-৮ বছর ধরে এই কয়লা স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব কয়লার হিসাব রাখা হয়নি। গোপনে এসব কয়লাও খনি কর্মকর্তারা নামমাত্র মূল্যে ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, প্রতি মেট্রিক টন কয়লার সরকার নির্ধারিত মূল্য হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে কয়লা বিক্রি করেছে প্রতিটি টন ১ থেকে ২ হাজার টাকা লাভ নিয়ে। এভাবেও খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে সিন্ডিকেটটি হাতিয়ে নেয় কয়েক কোটি টাকা।

খনির শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি বলেছেন, ৫ টনের স্থলে ১৫ টন দেওয়ার সুযোগ নেই। তা হলে কীভাবে কয়লা গায়েব হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। অবশ্য ঠিকাদার মিজানুর রহমান এটিকে সিস্টেম লস বললেও কয়লা লোড করা ট্রাক নথিভুক্ত না করে পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী বদরুদ্দোজা বলেন, খনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কয়লা চুরির আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।

জানা যায়, ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মোট ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪২ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত কয়লা থেকে পার্শ্ববর্তী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার ২৯ দশমিক ২৯ মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহ করা হয়েছে। বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে ডিওর মাধ্যমে ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন কয়লা বিক্রি করা হয়েছে। কয়লা খনির বয়লারে ১২ হাজার ৮৮ দশমিক ২৭ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহার করা হয়েছে। কয়লার উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার হিসাব করলে ১৯ জুলাই পর্যন্ত কোল ইয়ার্ডে রেকর্ডভিত্তিক কয়লার মজুদ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু বাস্তবে মজুদ ছিল প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন কয়লার ঘাটতি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি টাকা।

বাংলার কথা/তিতাস আলম/৩১ জুলাই, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*