Home » অন্যান্য » কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?
কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?

কিশোর সাগরের নির্যাতনকারীদের রুখবে কে?

আলী ইউনুস হৃদয়

খুলনায় শিশু রাকিব ও সিলেটে রাজনকে নির্যাতন করার সংবাদটি বছর দুয়েক আগের। আমরা অনেকেই ভুলে গেছি সেই নির্যাতন কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা। আর মনে রাখারই কি প্রয়োজন আছে! এদিকে মাত্র দুই দিন আগে গণমাধ্যমের সাহায্যে জানতে পারি চুরির অভিযোগে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় কিশোর সাগরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমন সংবাদে পাঠক হিসেবে আপনি বিচলিত হন নিশ্চয়ই? কিন্তু আমি হই না! কারণ শিশু-কিশোর নির্যাতনের সংবাদ এখন নিত্যদিনের চিত্র। খুলনায় শিশু রাকিবকে নির্যাতনের আগে সামিউলকে নির্যাতনের বিষয়টি ছাড়াও অসংখ্য নির্যাতনের খবর কিংবা দৃশ্য দেখেছি গণমাধ্যমে। শুধু পার্থক্য একটা জায়গায় এখন শিশু নির্যাতনের ধরণ পাল্টাছে। আর নব্য নির্যাতনকারীরা অবলম্বন করছে নির্যাতনের নতুন মাত্রা।

 

 

 

পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই নির্যাতনের বিবৃতি শুনে বিরক্তির ঢেঁকুড় তুলছেন। এবার একটু বিচারের পাওয়ার বিবৃতিতে আসি। শিশু রাকিব ও রাজন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ দেখেছি। ছয় জন নির্যাতনকারীকে ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত করা হয়েছে। আবার অনেক নির্যাতনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ধরণের চিত্র আমাদেরকে আশান্বিত করে। কিন্তু শঙ্কা থেকে যায়, শিশু নির্যাতনকারীদের রুখবে কে? শিশু-কিশোর হত্যাকাণ্ডের প্রভাব একটা পরিবারের জন্য কতটা বেদনার সেটা রাকিব, রাজন আর সাগরের পরিবার জানে! আমি আপনি হা-হুতাশ করে নিজেকে বুঝাই আমি তো নিরাপদ আছি! কিন্ত একজন শিশুকে যখন নির্যাতন করা হচ্ছে তখন কিন্তু আমরা নিরব দর্শকের ভূমিকায় নিজেদের নিরাপদ রাখছি। পরে আবার সে আমরাই নির্যাতনকারীর বিচারের দাবিতে মানববন্ধন কিংবা প্রতিবাদ সভায় অংশগ্রহণ করে নিজের দায়মুক্তির চেষ্টা করি। কিন্তু সরাসরি নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা আমাদের সমাজ, পরিবারে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিশু কিশোরদের আতঙ্ক নির্যাতনকারীরা তাদের সর্বোচ্চ পেশিশক্তির জোরে নির্যাতন করছে চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি হত্যা করে সহজেই পাড় পেয়ে যাচ্ছে।

 

 

 

কিন্তু এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার। আর এজন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন নির্যাতনের সময়ই নির্যাতনকারী পশুদের রুখে দেয়া। না হলে কখনোই এই শিশু-কিশোর নির্যাতনের চিত্র পাল্টাবে না বরং ভিন্নতা পাবে নির্যাতনের মাত্রা।

 

 

মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের পাম্প চুরির অভিযোগে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সাগরকে নির্মমভাবে মারধর করে আক্কাস আলী ও তাঁর সহযোগীরা। পরে অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে সাগরের মৃত্যু হয়েছে বুঝতে পেরে আক্কাস আলী ও তাঁর সহযোগীরা হ্যাচারির সামনে একটি কাশবনে লাশ ফেলে পালিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই নির্যাতনের ছবি প্রকাশ হয়। পরে পুলিশ কিশোর সাগরের লাশ উদ্ধার করে। মাত্র ১ হাজার টাকার অভাবে সাগরের লাশ নিয়ে আসতে পারছিল না সাগরের পরিবার। পরে বস্তিবাসীর সহযোগিতায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে সাগরের লাশ এনে দাফন করা হয়।

 

 

 

সাগর ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে কয়েক শ মিটার দূরে রেললাইনের দুপাশে পলিথিনের ছাউনি দেওয়া ১৫ থেকে ২০টি ঘর নিয়ে ছোট বস্তির একটা ঘরেই বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতো। পরিত্যক্ত জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করত সাগর। তার বাবা শিপন মিয়া প্রসাধন সামগ্রী ফেরি করেন। বড় ভাই আলমগীর ঢাকায় ফেরি করে খাবার বিক্রি করেন। তাঁদের উপার্জনেই কোনো রকমে সংসার চলে।

 

 
সাগরকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনায় আক্কাস আলী, তাঁর ভাই হাসু মিয়া, ছাত্তার, জুয়েল, সোহেল ও শ্রমিক কাইয়ুমের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে মামলা করে সাগরের বাবা। পুলিশ ওই দিন রাতে রিয়াজ উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া হত্যাকান্ডের মূল হোতা আক্কাস আলীকে গতকাল শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সাগর হত্যা মামলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

 

 

 

সন্তানকে হারিয়ে সাগরের মা নির্যাতনকারীদেরে বিচার চেয়েছে। তাছাড়া যে আর কিছুই চাওয়ার নেই সন্তানহারা মায়ের! কান্নাজড়িত কন্ঠে সাগরের মা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। তবু কোনো দিন আমরা কেউ চুরি করি না। আমার ছেলে চুরি করতে পারে না। আমার ছেলেকে অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করে যারা মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’ সাগরের মায়ের সঙ্গে বলতে চাই, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই সাগরের নির্যাতনকারীদের। কারণ সামান্য চুরির অভিযোগ এনে শিশু কিশোর কিংবা প্রাপ্ত বয়স্ক যে কাউকে নির্যাতন করার কোন অধিকার নেই সমাজের এসব নরপশু দানবাদের। সেজন্য আইন ও বিচার ব্যবস্থা আছে।

 

 
পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, সাগরকে নির্যাতনের সময় সেখানে অনেকে উপস্থিত ছিলো কিন্তু কেউ নির্যাতনকারীদের নিবৃত্ত করেনি। হয়ত নিরবে অনেকে ব্যথিত হয়েছেন। কেউ নিভৃতে নির্যাতনকারীদের ধিক্কার করেছেন! কিন্তু তাতে সাগরের কি হয়েছে? মাঝখান থেকে একটি পরিবার হারিয়েছে সদস্যকে। পিতা-মাতা হারিয়েছে এক সন্তানকে। আর যদি এমন হতো স্থানীয়রা সংঘবদ্ধ হয়ে আক্কাস আলী ও তাঁর সহযোগীদের রুখে দিয়ে সাগরকে রক্ষা করেছে, হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত সাগর। কিন্তু তা হয়নি! পাঠকের কাছে প্রশ্ন আর কতো নিজেকে নিরবে কিংবা নিভৃতে রেখে নামকাওয়াস্তে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে দায়মুক্তির চেষ্টা করবেন? বরং একত্রিত হয়ে এসব শিশু-কিশোর নির্যাতনকারীদের সরাসরি প্রতিহত করুন। তাহলে হয়তো সংবাদের শিরোনামে দেখতে পাবো ‘এলাকাবাসীর প্রতিরোধে নির্যাতনকারীদের হাত থেকে রক্ষা পেল এক যুবক’। খুব সহজে আশাহত হতে পারি না আমি, তাই এখন সময় এসেছে শিশু-কিশোর নির্যাতনকারীদের সরাসরি প্রতিরোধ করার, রুখে দেওয়ার। তাই প্রিয় পাঠক প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকায় নিরব না থেকে সংঘবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসুন নরপশু শিশু-কিশোর নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে। তাহলে আর নির্যাতনকারীদের হাতে হত্যাাকাণ্ডের শিকার হতে হবে না রাকিব, রাজন ও সাগরদের…

 

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।