Today December 13, 2017, 1:59 am |
Home » খোলামত » স্মৃতি-বিস্মৃতি : উপরে কোথায়?

স্মৃতি-বিস্মৃতি : উপরে কোথায়?

হাসান মীর ০

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। আমার বয়স আট, সেবারই গ্রামের জুনিয়র স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছি। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল রেললাইন (স্বাধীনতার পর উঠে গেছে, এখন সেখানে এলজিইডির পাকা সড়ক) । সেই রেললাইনের দুই পাশেই অনেকটা করে অব্যবহৃত খালি জমি। তারই আমাদের দিকের অংশে পাড়ার যুবকেরা ‘গাদন’ (অনেক এলাকায় দাড়িয়াবান্ধা নামে পরিচিত) খেলেন। যেদিন তারা থাকেন না, সেদিন আমরা সুযোগ পাই, অন্যদিন থাকে দর্শকের ভূমিকা।

 

একদিন বিকেলে ওই রকম খেলা চলছে, এরমধ্যে বিচিত্র পোশাকধারী এক অচেনা ভদ্রলোককে এদিকেই আসতে দেখে সবাই খেলা ফেলে দৌড়ে রেললাইনের উপর উঠে গেলেন। আমরা ছোটরাও বড়দের পিছু নিলাম। ভদ্রলোকের পায়ে চপ্পল, পরনে ধুতি, গায়ে লম্বাঝুলের খদ্দরের জামার ওপর ফতুয়া জাতীয় কোট। আর সবচেয়ে অবাক হওয়ার ব্যাপার- তাঁর মাথায় বড় একটা মাথাল, যে রকমের মাথাল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের কৃষক ক্ষেতে কাজ করার সময় মাথায় পরে থাকেন।

 

লক্ষ্য করলাম সবাই তাঁর সাথে অত্যন্ত ‘তমিজ’ বা ‘আদবের’ সঙ্গে কথা বলছেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে স্থানীয়দের একজন বললেন: স্যার, গোলাপনগরের পোস্টঅফিসটা উঠে যাওয়ায় আমাদের খুব সমস্যা হচ্ছে, চিঠিপত্র আসছে না –। জবাবে তিনি বললেন: সবাই মিলে উপরে দরখাস্ত দাও, এলাকার এত মানুষের অসুবিধা হচ্ছে.. । কথাবার্তা শেষে তিনি আবার রেললাইনের পাশ দিয়েই হেঁটে চলে গেলেন।

 

পরে নূরুল হুদা মামাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল অচেনা ভদ্রলোকের নাম প্রমথ রায় (উচ্চারণ প্রোমথো), ভারতের আগ্রার কাছে ফিরোজাবাদ কলেজের প্রফেসর, আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দুয়েক দূরে গোলাপনগরে তাঁর বাড়ি (থানা ভেড়ামারা, জেলা কুষ্টিয়া) । তিনি পৈত্রিক বাড়িতে এলেই নাকি আশেপাশের গ্রামের লোকদের সাথে দেখা করে খোঁজখবর নেন।

 

কিন্তু এসব তথ্যে নয়, আমার কৌতুহল অন্যত্র, তিনি যে বলে গেলেন “উপরে দরখাস্ত” করতে হবে — সেই উপরটা কোথায়, কে নেবেন সেই দরখাস্ত? এতদিন জেনে আসছি আমাদের মাথার উপর আকাশ, সেই আকাশের ওপারে থাকেন আল্লাহ, আছেন তাঁর ফেরেশতারা আর বেহেস্ত-দোজখ। তাই যদি হয়, তাহলে পোস্ট অফিসের দাবিনামাও কি আল্লাহর দরবারেই পাঠাতে হবে? মামা বোঝালেন — আরে পাগল না, দরখাস্ত পাঠাতে হবে উপরমহলে, সরকারের বড় কর্তাদের কাছে। আমার ধাঁধা কাটে না। আট/নয় বছরের একটি শিশুর কাছে উপর, উপরমহল আর আকাশের ওপারে থাকেন যে মহাশক্তিধর সৃষ্টিকর্তা, সর্বশক্তিমান আল্লাহ কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়।

 

এরপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। এখন ‘উপর’ আর নানা পদ ও পদবির প্রভূত ক্ষমতাধর ‘উপরওয়ালাদের’ সম্পর্কে আমার জানা হয়ে গেছে। আকাশের ওপারে যে ‘উপরওয়ালার’ অবস্থান (?) শৈশবে বড়দের কাছে পাওয়া সেই ধারণাও এখন আর আগের মতো নেই। আছে কেবল প্রায় সাত দশক আগের অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি আর বিচিত্র পোশাকধারী সেই মানুষটির নাম। (শুনেছি অধ্যাপক প্রমথ রায় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের দোসরা অগাস্ট ৭৬ বছর বয়েসে উত্তর প্রদেশে তাঁর কর্মস্থলেই মারা যান। তাঁর একপুত্র ভগবানসিংহ রায়, দামুকদিয়া হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, এখনও তাদের পৈত্রিক ভিটায় বাস করেন, তবে বিস্তারিত জানা হয়নি )।

 

ছবিতে গম্ভীরা গানের শিল্পীদের মাথায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য- মাথাল, সংগৃহীত।

 

 

০ হাসান মীর, বাংলাদেশ বেতারের অবসরপ্রাপ্ত সংবাদকর্মী।

 

বাংলার কথা/অক্টোবর ৩১, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com