Today May 27, 2018, 9:19 pm |
Home » ইতিহাস-ঐতিহ্য » সেই কুঠিবাড়িতে এখন বইছে সুবাতাস

সেই কুঠিবাড়িতে এখন বইছে সুবাতাস

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালেই নীলকর সাহেবরা চামড়া দিয়ে মোড়ানো বেতের লাঠি দিয়ে পেটাতেন কিষাণ-কিষাণীদের। তাদের আর্তনাদে পদ্মার গর্জন ছাপিয়ে ভারি হয়ে উঠতো কুঠিবাড়ির আকাশ। সেই কুঠিবাড়িতে এখন বইছে সুবাতাস। গড়ে উঠেছে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। দেশী-বিদেশী বিশাল বিশাল বৃক্ষের ছায়াঘেরা সেই প্রাকৃতিক পরিবেশে এখন পুলিশ সদস্যদের পড়ানো হয় সুশাসন আর মানবতার পাঠ্যক্রম।

রামপুর ও বোয়ালিয়া। ছোট এ দু’টি গ্রাম থেকেই গোড়াপত্তন ঘটে আজকের বিভাগীয় শহর রাজশাহীর। তবে শহরটি নিজে নিজে গড়ে উঠেনি। এর পেছনে রয়েছে ওলন্দাজ বা ডাচ বণিকদের এক অনন্য অবদান। একইভাবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীও গড়ে উঠেছে ডাচ বণিকদের স্থাপিত কুঠিবাড়িকে কেন্দ্র করেই।

সারদা এক সময় ছিল বাঘ-ভালুকসহ হিংস্র জীব-জন্তুর আবাসভূমি। তবে স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার কারণে ডাচ বণিকরা রেশম সুতার বাণিজ্য করতে এখানে বানায় সুদৃশ্য কুঠিবাড়ি। এদের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে এক জনপদ। ওলন্দাজরা চলে যাবার পর ওয়াটসন কোম্পানী এখানে শুরু করে নীল চাষ। যা বাংলার ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে তাড়িত করে। নীল চাষের নামে বর্বর এই ওয়াটসন কোম্পানীর নীলকর সাহেবরা এখানকার কিষাণ-কিষাণী ও বউ-ঝিদের কুঠিবাড়িতে আটকে রেখে চালাতো অবর্ণনীয় নির্যাতন। নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালেই নীলকর সাহেবরা ‘শ্যামা চাঁদ’ (চামড়া দিয়ে মোড়ানো বেতের লাঠি) দিয়ে পেটাতেন এখানকার কিষাণ-কিষাণীদের। যার পরিণামে এক সময় বাংলায় সৃষ্টি হয় নীল বিদ্রোহ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, রাজশাহীতে প্রচুর রেশম চাষ হতো, উৎপাদিত হতো রেশম সুতা। এখানকার আবহাওয়া ছিল বেশ স্বাস্থ্যকর। বিষয়টি জানতে পেরে সপ্তদশ শতাব্দির শেষের দিকে ওলন্দাজ বণিকরা পদ্মা নদী দিয়ে পানি জাহাজে করে এখানে এসে আস্তানা গাড়েন। ওই সময় রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল পূর্বে পদ্মা পাড়ের সারদাহ্ এলাকায় ওলন্দাজরা নির্মাণ করে বড়কুঠি ও ছোট কুঠি নামের দুটি সুরম্য অট্টালিকা। সেই বড়কুঠি এখন ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর অফিসার্স মেস হিসেবে। ছোটকুঠি এখন একাডেমীর প্রিন্সিপালের বাসভবন। এছাড়াও সেখানে রয়েছে আরো প্রাচীন ইমারত। ইন্দো-ইউরোপীয় কায়দায় নির্মিত এসব কুঠির নির্মাণ শৈলী অবাক করার মতো। দরজাগুলো হচ্ছে সেগুনকাঠের কারুকার্য খচিত, পুরো মেঝে রয়েছে শ্বেতপাথরে ঢাকা। এলাকা জুড়ে রয়েছে প্রাচীন কালের দেশী-বিদেশী রেইনট্রি, মেহগনি, দেবদারু, ঝাউ গাছ ও আম-লিচুর বাগান।

প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদ তাঁর ‘রাজশাহীর ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বলেছেন, পলাশীর যুদ্ধের পরে ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যুদ্ধ হলে ডাচরা পরাজিত হলে সারদার বড়কুঠি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মালিকানায় আসে। ‘চার্টার অফ অ্যাক্ট’ প্রবর্তনের কারণে ব্রিটিশরা ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে বড়কুঠি বিক্রি করে দেয়মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন এন্ড কোম্পানীর কাছে। ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানী এখানে নীল চাষ ও ব্যবসা শুরু করে। এক সময় এখানে কলেরা মহামারীতে কুঠিয়ালসহ কর্মকর্তারা মারা যায়। ধস নামে তাদের ব্যবসায়। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে কুঠিবাড়ি।

‘বাংলাদেশ পুলিশ, উত্তরাধিকার ও ব্যবস্থাপনা’ গ্রন্থে আহমেদ আমিন চৌধুরী বলেছেন,  ভারতের পুলিশ বিভাগে অনাচার, অরাজকতা ও দুর্নীতি দেখা দিলে লর্ড কার্জন ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করেন। কমিশনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে রাজশাহী অঞ্চলে একটি পুলিশ অফিসার্স ট্রেনিং কলেজের স্থান নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করা অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজ মেজর পুলিশ সুপার মেজর এইচ চেমনীর ওপর। তিনি রাজশাহী সফর শেষে স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে সারদার কুঠিবাড়িকে নির্বাচন করেন। ১৪২ দশমিক ৬৬ একর এলাকা বেষ্টিত এ পরিত্যক্ত কুঠিবাড়িতে স্থাপন করা হয় সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজ। ১০৩ জন কনস্টেবল, ৭ জন সহকারী পুলিশ সুপার ও ২৫ জন ক্যাডেট সাব ইন্সপেক্টরকে প্রশিক্ষণদানের মধ্য দিয়ে ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাস থেকে পুলিশ ট্রেনিং কলেজের যাত্রা শুরু হয়। পুলিশ সুপারের পদমর্যাদায় মেজর (অব.) এইচ চেমনীকে কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কলেজটি উপমহাদেশের প্রথম শ্রেণীর পুলিশ ট্রেনিং কলেজ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ফলে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে পুলিশ ট্রেনিং কলেজকে একাডেমীতে পরিণত করে।

বর্তমানে ঘোড়ার ব্যবহার না থাকলেও ঐতিহ্যগত কারণে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে এখনো অশ্বারোহণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে রয়েছে ক্ষীপ্রগতি সম্পন্ন বিশাল বিশাল আকৃতির ঘোড়া। পাশপাশি এখানে দেয়া হয় অস্ত্র চালানোর চালানোর প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণকালে পুলিশ সদস্যদের পড়ানো হয় সুশাসন আর মানবতার পাঠ্যক্রম।

বাংলার কথা/মার্চ ১০, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com