Today October 18, 2017, 2:48 am |
Home » অন্যান্য » সবাই এখন পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী নয়!

সবাই এখন পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী নয়!

জান্নাতুল জান্নাত ০
সাকিব (ছদ্মনাম) পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। সকালটা শুরু হয় একটু তাড়াতাড়িই। কোনমতে নাস্তা সেরে ছুট দেয় স্কুলে। কাঁধে বই ভর্তি ব্যাগ। স্কুল শেষে ক্লাস টিচারের কাছে পড়তে যাওয়া। বিকেলে বাড়ি ফেরা। সন্ধ্যা নামতেই বাসার শিক্ষকও হাজির। এভাবেই পার হয় সাকিবের মতো হাজারো কোমলমতি ছাত্রদের শৈশব। বিকেলের নির্মল আড্ডা কিংবা নিজের ভাললাগার কোন কিছুই তাদেরকে স্পর্শ করছে না। শিক্ষা কি সেটা না বুঝিয়েই রীতিমত গলাধঃকরণ করানো হচ্ছে সাকিবদের।

 

 

 

যে বয়সে একজন ছাত্রের সুষ্ঠু মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পেছনে দৌঁড়ানোর কথা, সে সময়ে আজ রোবটের মতো চলতে হয়। প্রাইভেট, হোমওর্য়াক আর স্কুল। দিনশেষে যেন রোবটকেও ছাড়িয়ে যায় এসব কোমলদিন ছোটাছুটি। কিন্তু কেন? কারণ তাদের ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে হবে। ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে। পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেতে হবে। না পেলে বাব-মা মনে করে, এই ছেলে কিংবা মেয়েকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু কেন এখনই এতসব পরীক্ষার মুখোমুখি এসব বাচ্চারা। বাবা-মায়ের চাওয়া পাওয়ার বলি হতে হয় প্রতিনিয়ত। আর সে চাওয়া পাওয়ার হিসবাটা না মিললে বাবা-মা হেরে যায়। পুরো চিত্রটা আজ আমাদের অভিভাবকদের মানসিকতার দৃশ্যপট। আর এই চিন্তাধারায় তাদেরকে বেড়ে তুলতে উঠে পড়ে লাগে অভিভাবকেরা। অভিভাবকদের ভাবনা এমন যে শুধু জিপিএ-৫ পেলেই ভালো ছাত্র তার ছেলে কিংবা মেয়েটি। ধীরে ধীরে যখন ছেলেটি প্রাপ্তবয়স্ক হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক তখনও একট অবস্থা আমাদের অভিভাবকদের। মনে করে আমার সন্তানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে পারলে ভালো মানুষ হতে পারবে না। কিন্তু ভালো মানুষ কিংবা মনুষ্যত্ববান হয়ে উঠা আমাদের দেশে বিট্রিশ ধারার প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্ভব। কখনোই নয়! এজন্য প্রয়োজন অভিভাবকের ইতিবাচক মানসিকতা আর সন্তানকে সুন্দর পরিবেশে গড়ে তোলা। যেখানে সে ভালো-মন্দ বুঝে উঠবে। যে পরিবেশ কোমলমতি বাচ্চাটির মানসিক বিকাশে সহায়তা করবে। এর পুরোটাই নির্ভর করছে অভিভাবকদের প্রতিযোগিতামূলক চিন্তা পরিহার করার উপর।

 

 

 

মতিঝিলের একটি বিখ্যাত স্কুলে- প্রথম শ্রেণির ছাত্রটির ব্যাগের ওজন প্রায় তিন কেজি। আজিমপুরে মেয়েদের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির দুইজন ছাত্রীর ব্যাগের ওজন যথাক্রমে তিন কেজি নয়শ গ্রাম এবং চার কেজি দুইশ গ্রাম। ইস্কাটনে মাঝারি মানের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের কেজি ক্লাসের শিশুটি কাঁধ থেকে ব্যাগ নামাতে পারছিল না। নামিয়ে দিলেন এক খালা। মাপলে নির্ঘাত পাওয়া যেত দুই কেজি কম-বেশি। শিশুরা রোজ বাড়ি থেকে যে ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসে তাতে শুধু স্কুলের বই আর খাতাই থাকে তা নয়। কিছু কিছু বিদ্যালয় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে ব্যাগে এক সেট পোশাক থাকা বাধ্যতামূলক। টিফিন বক্স আর গলায় ঝোলানো পানির বোতল মিলে ওজন হয় চারশো গ্রাম। সিদ্ধেশ্বরীর একটি স্কুলে প্রায় প্রতিটি শিশুর ব্যাগে পাওয়া গেল বোর্ডের সমস্ত বই, যা তাদের প্রতিদিন পড়ানো হয় না, না আনলেও চলে -কিন্তু স্কুলের নির্দেশ সকল বই ব্যাগে থাকা চাই।

 

 

 

ড্রয়িং খাতাটি ছিল আকারে অনেক বড়। সেটি ব্যাগে ঢোকানো যাচ্ছিল না, তাই ড্রয়িং খাতাটি এসেছে শিশুর বগল তলায় চেপে। নামীদামী স্কুলগুলোয় ছুটির পর, বিকেলেই শুরু হয়ে যায় স্কুলের বাধ্যতামূলক কোচিং। তখন সাথে রাখতে হয় পাঠ্য বই এবং অবশ্যই গাইড বই। প্রতিটি গাইড বইয়ের ওজন কমবেশি এক কেজি। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ওজন সবমিলিয়ে হয় ছয় কেজি কারো ব্যাগ প্রায় সাত কেজি। কাঁধের ব্যাগের ওজন যেখানে সাত কেজি না হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন আলোর মুখ দেখে না আর সেখানে শিক্ষার মান উন্নয়ন কতটুকু হচ্ছে সেটাও বুঝতে বাকি থাকে না। আর প্রশ্ন থেকে যায় সাকিবদের মতো ছাত্ররা কতটুকু মানসিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে?

 

 

শুধু ছেলেমেয়েরা ছুটছে না সঙ্গে রাত পোহালেই ছুটাছুটি শুরু করে দেয় অভিভাবকরাও। বোঝার উপায় থাকেনা যে পড়াশুনা আসলে কে করছে আর পরীক্ষাই বা কে দিচ্ছে- সন্তান নাকি অভিভাবক! কিন্তু শেষমেশ ছাত্ররা জিপিএ-৫ পাবার পর বলছে-“আই এ্যাম জিপিএ ফাইভ”। এতকিছুর মাঝে অভিভাবকেরা ভুলে যান যে একজন শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার প্রয়োজন। আবার অনেকে জেনে বুঝেই শিশুদেরকে ঠেলে দিচ্ছেন পড়াশুনার গভীর সাগরে। শুধু অভিভাবকই নন, শিক্ষকদের কাছেও পড়াশুনা যেন ছাত্রদের থেকে বেশি মূল্যবান। অধিকাংশ শিক্ষকেরা পড়াশুনার মানের কথা চিন্তা করেন না, শিশুর বিকাশ নিয়েও ভাবেন না। সারাদিন একের পর এক প্রাইভেট পড়িয়ে যান নিজেদের স্বার্থের জন্য। খেলাধুলা, আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলিকেও তারা প্রাধান্য দেন না। আর কী করলে শিক্ষার্থীদের ভালো হবে সে ব্যাপারেও তারা অভিভাবকদের অবগত করতে আগ্রহী নন। সরকারি আর আধা সরকারি স্কুলসমূহ ব্যতীত খুব কম স্কুলেই খেলার মাঠ রয়েছে বরং বেশিরভাগ স্কুলেই স্বাভাবিক চলাচলের জায়গাটুকুও নেই।ব্যাঙের ছাতার মতো বাড়িতে বাড়িতে গজিয়ে উঠছে স্কুল, প্রাইভেট হোম। কারণ সবাই এখন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করায় বিশ্বাসী, শিখতে কিংবা জানতে নয়। যদিও কিছু স্কুলে খেলার মাঠ রয়েছে, কিন্তু আদৌ কি ছাত্র-ছাত্রীরা খেলাধুলার মাধ্যমে যথাযথ বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে? পাচ্ছেনা! কারণ তাদের সুষ্ঠু বিকাশের পরিবেশ দেয়া হচ্ছেনা, বরং ঠেলে দেয়া হচ্ছে ভালো ফলাফল অর্জনের প্রতিযোগিতায়। অবস্থা এমন যে, শিশুদের বিকাশ না ঘটলেও সমস্যা নেই কিন্তু গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেতেই হবে।

 

 

শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা মনে করছেন, আগে সবাই পড়াশুনা করতো শেখার জন্য, জানার জন্য। কিন্তু এখন পড়াশুনা করছে বাধ্য হয়ে কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের জন্য। যেন সবাই পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী। একই অবস্থা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও। যেন শিক্ষা গ্রহণের দুবেলা পেটপুরে আহার করার মতো হয়ে গেছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা অভিভাবকদের কাছে। ছাত্র-ছাত্রীরা আজ শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বেছে পড়ে। সম্পূর্ণ বই আর পড়ে না। পিইসি পরীক্ষা থাকার যৌক্তিকতার ক্ষেত্রে তারা মনে করছেন যে, পঞ্চম শ্রেণিতে পিইসি পরীক্ষা থাকায় এ বয়সের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের দিনরাত পড়ার জন্য চাপে রাখা হচ্ছে। ফলে তারা আজ শিখতে চায়না, ভালো ফলাফল করতে চায়। যদিও এই সময়টা তাদের আনন্দের সঙ্গে শেখা উচিত।

 

 

ছাত্র-ছাত্রীরা অংক করতে গেলে চিন্তা করে বিষয়ের গভীরে যাবার দরকার নেই। সংখ্যা দেয়া আছে শুধু সূত্রে বসিয়ে দিলেই হয়ে যাবে। ৫টি চকলেট থেকে ২টি চকলেট বন্ধুকে দিয়ে দিলে তোমার কাছে কয়টি চকলেট থাকবে? এমন অতি সাধারণ বিয়োগের গণিতেও শেখার বা জানার অনেক কিছু আছে যা অভিভাবক ও শিক্ষকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়িয়েই যান, প্রাইভেট পড়ান কিন্তু শেখার মতো শেখাচ্ছেন না। অংকের আসল বার্তা হলো বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করা। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা তা বুঝতে বা শিখতে পারছে না। কারণ এটা তাদের শেখানো হয়না। পড়াশুনা, স্কুল, প্রাইভেটেই তাদের সারাদিন কাটছে। কিন্তু সময়ের সাথে সময়োপযোগী বিকাশ হচ্ছে না। বিদেশ তো দুরের কথা, দেশের কোথায় কী হচ্ছে, না হচ্ছে তাও তারা জানতে পারছেনা, জানার আগ্রহবোধ করছে না। একজন ছাত্রকে যদি বলা হয়-“সিদ্দিকুরের চোখের আলো নিভে গেছে।”সাথে সাথে সে বলে ওঠে-“তাহলে সিদ্দিকুর এখন গলফ খেলবে কীভাবে?”এরা হলো আমাদের দেশের বর্তমান পরীক্ষার্থী, দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত! এদের মধ্যে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে, কিছু জানানো বা শেখানো হচ্ছে না। শুধু একাডেমিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়েই আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত স্বার্থকতা অর্জন করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। কারণ আমরা সবাই এখন পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী নয়!

 

 

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com