Today September 21, 2017, 9:14 am |
Home » উত্তরের খবর » শত্রুমুক্ত করেছি বিরিশিরি দূর্গাপুর – আব্দুস সালাম তালুকদার

শত্রুমুক্ত করেছি বিরিশিরি দূর্গাপুর – আব্দুস সালাম তালুকদার

মোছাঃ সিরাজুন্নাহার, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট ০

ভারতের মেঘালয় প্রদেশ তুরাতে একমাস স্পেশাল গেরিলা টেনিং সমাপ্ত করে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর মেজর প্রিথ ও সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন কর্ণেল তাহের ও কোম্পানি কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম সিরাজের অধিনে যুদ্ধ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে শত্রুদের মোকাবেলায় তিনি সবসময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ও বিড়িশিরি এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডারে বসবাসরত আব্দুস সালাম তালুকদার। তিনি ১৯৫৩ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার পুমদী ইউনিয়নের উত্তর পুমদী গ্রামের জহুর উদ্দিন মুন্সি বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। আব্দুস সালামের মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।

আব্দুস সালাম বলেন, তখন আমি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর কলেজে এইচ এস সি প্রথম বর্ষের বানিজ্য বিভাগের ছাত্র, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মা, মাটির টানে স্বাধীন বাংলার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ঐ বছরের জুন মাসের ২৭ তারিখ শুক্রবার ১০ জন একত্র হয়ে তৎকালীন হোসেনপুর-পাকুন্দিয়ার এমপি শামসুল ইসলাম গোলাপ ভাইয়ের অনুমতি পত্র নিয়ে গৌরীপুর হয়ে শম্মুগঞ্জের মধ্যস্থল দিয়ে খালনদী পার হয়ে পায়ে হেটে শিতাই যাই।
শিতাই থেকে আমাদেরকে ঢালু ক্যম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর ক্যাম্পে রিক্রট হই তারপর সেখান থেকে মেঘালয় প্রদেশের তুরা টেনিং সেন্টারে একমাস স্পেশাল গেরিলা টেনিং সমাপ্ত করি। তারপর জঙ্গল প্যারেট শেষে শপথ নিয়ে কোম্পানী কমান্ডারের নেতৃত্বে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। দুর্গাপুর সদর সহ কলমাকান্দার সীমান্ত এলাকা লেংগুরা,নাজিরপুর,এবং দুর্গাপুরের বিজয়পুর।
প্রশিক্ষণ শেষ করে অক্টোবর মাসের কোন এক তারিখে আমাদের আমাদের ৩৩ জনকে তিনদিনের জন্য (রুটি ও চিনি) খাদ্য ও স্টেনগান ও গোলাবারুদসহ নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বিজয়পুরে পাক বাহিনীর ক্যাম্প উড়িযে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
বিজয়পুর গিয়ে পাহাড়ে পাদদেশে অবস্থান করে পজিশন নেই। অমাদের অবস্খন সম্ভবত পাক সেনারা বুঝতে পারেনি। পরদিন সকালে পাহাড়ের পাশ দিয়ে ১০ জন পাক সেনা যাওয়ার পথে ব্রাশ ফায়ার করে তাদের হত্যা করে আনন্দ উল্লাসে জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারন করে এগিয়ে যেতে থাকি কিছুক্ষনের মধ্যে ওৎ পেতে থাকা পাক হানাদার বাহিনি এলোপাতারি গুলি শুরু করলে আমাদের ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা মাথায় আঘাত পেয়ে তৎক্ষনাৎ শহীদ হন।
পরে কয়েকদিন আমরা বিজয়পুর হাইডআউটে (লুকানো তাবু) তে থাকার পর অপি ডিউটিরত (উচু গাছের উপর থেকে শক্র পক্ষকে অবলোকন করা) ও স্পাইয়ের মাধ্যমে বিরিশিরিতে অবস্থিত শক্তিশালী পাকসেনা ঘাঁটির খবর জানার চেষ্টা করছিলাম।
পরে আমরা একই উপজেলার পাক হানাদার বাহিনীর মেজর সুলতানের নেতৃত্বে দুর্গাপুরের মিশনারীজ এলাকা বিরিশিরিতে অবস্থিত শক্তিশালী পাকসেনা ঘাঁটি দখল করার জন্য সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন কর্ণেল তাহের বীর-উত্তমের নেতৃতে কয়েক প্লাটুন মুক্তিবাহিনি, ই পি আর ও পুলিশ একত্রিত হয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। ৫ ডিসেম্বর বিজয়পুর থেকে বিরিশিরির দিকে অগ্রসর হতে থাকলে স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নেওয়ার খবর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়।
পরে প্রায় দেড়শতাধিক পাকিস্তানি সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করা জন্য এগুতে থাকে। এমন খবর পেয়ে আমরা সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেই। এবং দুপুর থেকে রাতা পর্যন্ত থেমে থেমে চলে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। এ সময় উকি মেরে দেখার চেষ্টা করলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আমার প্লাটুনের এল এমজি চালক হ্রুন ভাই। তার দেহ রক্তাত্ত হয়ে মাটিতে লুঠিয়ে পড়া অবস্থায় তিনি জয়বাংলা বলতে থাকেন। তখন আমি তার এল এম জি হাতে তুলে নিয়ে ফায়ার করতে শুরু করলাম। এ ভাবে যে যার মত পজিশন থেকে গুলি করতে করতে রাত ঘনিয়ে আসে।
এক পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলি বর্ষন থেমে যায়। আমরা থেকে খেকে গুলি করতে থাকি। কিন্তু পাক সেনাদের কোন প্রতিউত্তর নাই। পরদিন সকালের দিকে জানতে পারি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটেছে। পতন ঘটে বিরিশিরি শক্তিশালী পাক ঘাঁটির। ভোর হওয়ার পূর্বেই হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। সকাল হওয়ার (৬ ডিসেম্বর) সাথে সাথেই জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্মিত হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে ঘড় থেকে বেড়িয়ে আসে মুক্তিপাগল জনতা। পাক হানাদারদের ঘাঁটিতে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম তালুকদার মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আবারও লেখাপড়া শুরু করেন। এইচ এস সি পাশ করর পর তিনি ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা অনার্সে ভর্তি হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ কলেন। শিক্ষকতা পেষায় নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তার স্ত্রী তহফিকা আকতার বানু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত, তাদের দুই ছেলে। বড় ছেলে তনময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত ও ছোট ছেলে তুরাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখনও স্বপ্ন দেখেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা একদিন বাস্তবায়ন হবে। যেখানে থাকবে না কোনো ভ’য়া মুক্তিযোদ্ধা, থাকবে না কোনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি। দালালরা এদেশের যেন কোনো ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য প্রতিটি সচেতন নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এই মুক্তিযোদ্ধা।
বাংলার কথা/ মোছাঃ সিরাজুন্নাহার/১৫ মার্চ, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com