Today June 16, 2018, 11:18 pm |
Home » উত্তরের খবর » রাজশাহীর বাতাসে অ্যামোনিয়া, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

রাজশাহীর বাতাসে অ্যামোনিয়া, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
রাজশাহীর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। রাজশাহী রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলের জমি লীজ নিয়ে গড়ে তোলা বিসিআইসি’র সার গুদাম চত্বরে প্রায় দিনই খোলা আকাশের নীচে স্তুপ করে রাখা হয় ইউরিয়া সারের বস্তা। দিনের পর দিন খোলা আকাশের নীচে সার রাখায় সেখান থেকে সৃষ্ঠ অ্যামোনিয়া গ্যাস মিশে যাচ্ছে বাতাসে। ফলে এলাকার শত শত মানুষ নিঃশ্বাসের সাথে অ্যামোনিয়া গ্যাস গ্রহণ করে ভুগছেন নানা ধরণের শারীরিক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়। তবে গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি, গুদামে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি সার আসায় প্রায়শই খোলা আকাশের নীচে রাসায়নিক সার রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

রাজশাহী বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল হাই বলেন, সারের মধ্যে থাকা অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসের মধ্যে  ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে। যা মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই পরিবেশ থেকে বাঁচতে রাসায়নিক সারের গুদামটি স্থানান্তরের আর্জি জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেও ফল পায়নি এলাকাবাসী।

নগরীর শাহ মখদুম থানা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ বাদশা শেখ বাস করেন শিরোইল কলোনী এলাকায়। তিনি জানান, নগরীর সবচেয়ে ঘনবসতি এলাকা হচ্ছে ১৯ নং ওয়ার্ডের শিরোইল কলোনী। কলোনীর তিন নম্বর গুলির প্রবেশ মুখে বিসিআইসি’র সার গুদাম এলাকাবাসীর জন্য অভিশাপ ডেকে এনেছে। প্রায় দিনই গুদামের বাইরে খোলা আকাশের নীচে স্তুপ করে রাখা হয় রাসায়নিক সার। প্রতি সন্ধ্যায় স্তুপ করে রাখা বস্তার রাসায়নিক সার থেকে ঝাঁঝাল দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত আ্যামোনিয়া গ্যাসের তীব্র গন্ধ ভেসে আসে। ফলে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।

এলাকার বাসিন্দা ১৯ নং ওয়ার্ড (দক্ষিণ) আওয়ামীলীগের সভাপতি রেজাউল হক মঞ্জু বলেন, দিনের বেলায় আ্যামোনিয়া গ্যাসের ঝাঁজ তেমন একটা বোঝা না গেলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে গ্যাসের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। এসময় এলাকার লোকজন প্রয়োজনীয় কোন কাজ না থাকলে বাড়ির বাইরে বের হতে চায় না। আবার অন্য এলাকার লোকেরাও শিরোইল কলোনী এলাকায় আসতে অস্বস্তি বোধ করে। এলাকার লোকেরা গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধে নাকে মুখে কাপড় বেঁধে চলাচল করে। তিনি রাসায়নিক সারের গুদামটি জনবহুল এলাকা থেকে অবিলম্বে সরিয়ে নেয়ার দাবি জানান।

সার গুদামের পাশের বাসিন্দা সাইমুম আরেফিন মিসির বলেন, আমরা যারা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছি, তাদেরকে দিনরাত বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। ঝাঁজাল ও বিষাক্ত আ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে স্থানীয়রা পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাস কষ্ট, হাঁচি, চোখ জ্বালাসহ শরীরের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

সার গুদামের প্রধান ফটকের কাছে মুদিখানার এক দোকানী বলেন, আমি সারাদিন এখানে বসে ব্যবসা করি। সারাদিন এই বিষাক্ত পরিবেশে বসে থাকছি। এই ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে আমার কোন রোগ হলে এর দায় কে নেবে? স্থানীয় এক বয়স্ক নারী বলেন, সন্ধ্যার পর বাসায় থাকা যায় না। রাতে গ্যাসের কারণে শরীর ব্যথা করে। তখন ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারি না।

সাইমুম আরেফিন মিসির নামে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, বহুদিন থেকে আমরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করে আসছি। তবে কেউ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নগরীর মধ্যে এমন বিষাক্ত পরিবেশ মেনে নেয়া যায় না। মানুষই যদি না বাঁচে তাহরে সার দিয়ে কি হবে, প্রশ্ন করেন তিনি।

সার গুদামের পাশে চেম্বার রয়েছে রাজশাহী জেলা জজ আদালতের আইনজীবী ও মহানগর আওয়ামীলীগের নির্বাহী সদস্য সৈয়দা শামসুন্নাহার মুক্তির। তিনি বলেন, অবস্থা এমন দাড়িয়েছে, সন্ধ্যার পর থেকে ঝাঁঝালো গন্ধে চেম্বারে টেকা যায় না। দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখলেও অসহ্য ঝাঁঝে চোখ জ্বালা পোড়া করে। ভয়ে কোন ক্লায়েন্ট ও আত্মীয় স্বজন এদিকে আসতে চায় না।

জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জমান টিটো বলেন, আমার কাছে শিরোইল কলোনীর বাসিন্দারা সার গুদামের কারণে তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছে। আমি তাদের অবস্থা অনুভব করতে পারছি। তবে বিষয়টি সরকারের। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে আমরা সার গুদামটি অন্যত্র স্থানান্তর করে নেয়ার আবেদন করেছি। আশা করি সরকার আমার ওয়ার্ডবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এদিকে ভুক্তোভোগী এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান স্থানীয় বাসিন্দা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের রাজনৈতিক ফেলো ও মহানগর আওয়ামীলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দা শামসুন্নাহার মুক্তি। তিনি বলেন, বিসিআইসি’র রাসায়নিক সারের গুদামে দেশে উৎপাদিত সারের পাশাপাশি চীন, আবুধাবী ও কাতার থেকে আমদানী করা সার রাখা হয়। গুদামটিতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি সার রাখা হচ্ছে। যা গুদামের বাইরে খোলা আবাশের নীচে পরে থাকছে। ফলে এই রাসায়নিক সার থেকে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস বের হচ্ছে। রাসায়নিক সারের এই গুদাম থেকে নিঃসরিত অ্যামোনিয়ার প্রভাবে স্থানীয়রা স্থাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে সার গুদামের ইনচার্জ ও বিসিআইসি’র ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গুদামে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সার রাখা হয়। গুদামের ধারণ ক্ষমতা ৮ হাজার মেট্রিক টন। তবে চাহিদার কারণে সারের পিক সিজনে এই গুদামে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন সার সংরক্ষণ করতে হয়। তখন গুদামের ভেতরে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় বাইরেই রাখতে হয় সারের বস্তা। তবে এই কর্মকর্তা জানান, শীঘ্রই ২৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন সারের একটি গুদাম নির্মাণের জন্য নওদাপাড়া এলাকায় জায়গা খোঁজা হচ্ছে। সেখানে গুদাম নির্মাণ করা হলে এখানকার সমস্যা আর থাকবে না।

বাংলার কথা/মার্চ ০৫, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com