Today November 25, 2017, 7:34 am |
Home » নাগরিক সংবাদিকতা » ভাস্কর্য ছেড়ে শরিফ নাট্যলিপিতে পরিচিতি চান

ভাস্কর্য ছেড়ে শরিফ নাট্যলিপিতে পরিচিতি চান

নজরুল ইসলাম তোফা ০
মনের ক্ষুধা বড় ক্ষুধা। এ ক্ষুধা ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও কখনো সখনো মিটানো যায় না হাজারও পরিশ্রম করে কিংবা গভীর ধ্যান জ্ঞানের সমন্বয় সাধনে। অবশ্য মনের ক্ষুধা মিটাতে সুদুর প্রসারী কল্পনা নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি জমিয়েও অনেকে হয়ে যায় ব্যর্থ। কিন্তু মিডিয়া জগতে স্বপ্নে বিভোর এবং মিডিয়াকে কর্মে বাস্তবায়নের লক্ষে এমনও কেউ কেউ আছেন, যারা অজস্র ব্যর্থতাকে জয় করতে সর্বদা প্রস্তুত।

শৈশবের স্বপ্নবাজ সেই মুক্ত মনের এমন মানুষও আছেন, যারা হাজারও প্রতিকুলতার মাঝেও জীবনের আশা-আকাঙ্খা পূরনের লক্ষে গঠনমূলক ভাবধারায় অনেক নাটকের পান্ডুলিপি লিখে বহু দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। এমনই একজন গুনধর, চৌকস, মেধাবী যুবক প্রগাঢ় ইচ্ছা শক্তি নিয়ে শিল্প সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় হাত দিয়ে সফল হয়েছেন। কিন্তু উপার্জনের চিন্তা মাথায় ভর করলে কি আর ভালো মতো শিল্প চর্চার জগতে প্রবেশ করা সম্ভব। তবুও আর্থিক দৈন্যতার মাঝেও বৃহৎ পরিতৃপ্তিতে উপার্জনের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতির চর্চার হাল ধরেই সাফল্য খোঁজেন। লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া আর অর্থ উপার্জনের অমশ্রিণ পথ হয়ে যায় তাঁর নিত্য সঙ্গী।

আসলে তাঁর যে কোনই পথ নেই, সংসারে উপার্জন না করলে পেটে-ভাতে বাঁচাতো অনেক দূরহ ব্যাপার। তবুও অনেক বাধা অতিক্রম করে নির্জনে নিভৃতে সময় পেলেই শিল্প সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় গভীর ধ্যান জ্ঞানে মগ্ন হয়ে থাকেন। নির্মম বাস্তবতায় কখনো সখনো অত্যন্ত প্রিয় বিষয় লেখাপড়া থেকেও তাঁকে অনেক কষ্টে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। অর্থই জীবনের মূল যখন বুঝতে পারলেন, তখন জীবন সংগ্রামে আর দেরি না করেই নেমে পড়লেন। কত শত পথ যে আরও পাড়ি দিতে হবে তিনি নিজেও মালুম করতে পারেন নি। পিতা মৃত ইসমাইল সরদারকে হারানোর পর অবশ্য তাঁর মা রমিচা বেগমকে নিয়ে চার ভাই ও এক বোনসহ সংসার নামক জাতাকলে পিষ্ট হয়ে চলছেন সংগ্রামী সেই যুবক। মানুষের বিবেককে তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম হৃদয়কে অবশ্যই আন্দোলিত করবে। তিনি ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়, তাঁর ডাক নাম শরিফ। পুরো নাম হলো শরিফুল ইসলাম শরিফ।

সংসারে বড় হওয়া যে জ্বালা, সে জ্বালা তিনি টের পান জীবন সংগ্রামে নেমে। যৌবনের শুরুতেই পর্বত প্রমাণ দুঃখের বোঝা বহন করতে তাঁর ক্লান্তি ভর করেছিল তা তিনি জানালেন। আবার ক্লান্তি নামক বোঝাটাও নামিয়ে রাখার বাসনা তাঁর মাঝে মধ্যে জাগ্রত হতো। বাড়ির পাশেই ছিল এক ভৈরব নদী, হেঁটে যেতে প্রায় পনের বিশ মিনিটের পথ। সে নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় পানির স্রোতে মনকে কিছুক্ষণ ভাসিয়ে একাকিত্বের হাজারও কল্পনার রাজ্যে চলে যেতেন। একটি বাজার ছিল তাঁর বাড়ির পাশে, ‘পথের বাজারে’ তিনি বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা হৈ হুল্লড়ে কাটিয়েছেন সময়। পড়াশোনায় অনেক ভালো ছাত্র, শিক্ষা তাঁর অনেক ভালো লাগতো। ছোট থেকেই তিনি সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি আনন্দ উল্লাসে প্রতিটি দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বলা চলে তাঁর বাবা ইসমাইল সরদার অকালে মৃত‍্যুর কুলে ঢলে পড়লেন। মা রমিচা বেগম সহ আরো চার ভাই ও এক বোনকে নিয়ে বিপাকে পড়েন শফিক।

ভাই বোনের মধ্যে পরিবারের বড় হওয়ায় সব দায়িত্ব মাথা পেতে নিতে হয়েছে তাঁর। এত সদস্যে মাঝে কষ্টের পুরো সংসার ইতিবাচকভাবে তিনিই চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। ২০০৫ সালে এইচএসসি পাশের পর তিনি উচ্চ শিক্ষার চিন্তা মাথায় নিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার সামান‍্য বেতনের চাকরিতে কোন মতে পেটে-ভাতে ভালোই চলছিল। বাবা ছিলেন জুট মিলের সামান্য একজন শ্রমিক, কিছুই সঞ্চয়ে রেখে যেতে পারেননি। বাবার অবর্তমানে উপার্জনের হাল ধরতে হয়েছিল তাঁকে। তাই তো তিনি মায়ের মমতা ছেড়ে গ্রামের বন্ধু বা মনোরম পরিবেশ ভুলে হঠাৎ একদিন পাড়ি দিলেন ঢাকার উদ্দ্যেশে।

গার্মেন্টসে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের চাকরিতে মজুরি ছিল অতি সামান‍্য। যৎ সামান্য বেতনের প্রাপ্তিটাও তাঁকে অনেক সময় ঝামেলায় ফেলে ছিল। তিনি কিছু দিন এ কষ্টের চাকরি করার পর বিভিন্ন কারণে গার্মেন্টসে থেকে ইতি টানলেন।

শরিফুল ইসলাম শরিফ জানালেন, ভালো লাগে না কিছুই। শুধু মন পড়ে থাকে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার দিকে। সেই টানে ২০০৮ সালে আবার গ্রামে ফিরে এসে কলেজে ভর্তি হলেন তিনি। বি.এ পাশ তাঁকে করতেই হবে। কলেজে কিছু দিন পড়াশোনার পাশাপাশি বিকেলটা যে তাঁর ছিল একাকিত্বের আর অবসরের। তাই তিনি পুনরায় বিভিন্ন চিন্তা চেতনায় সংস্কৃতি চর্চার ভাবটি জাগ্রত করলেন, সেই ভাবটি যা ছিল শৈশবে। এমন স্থির সিদ্ধান্তে প্রথমত: তার মৌলিক ভাবনা ছিল ভাস্কর্যে। আরও পরে শিল্প-সংস্কৃতির শাখা-প্রশাখায় বিভিন্ন কল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন।

শরিফ বলেন, এ পথে তাঁর আদৌ ছিল না কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। ২০০৮ এ তিনি শুরু করেছিলেন মাটি দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ। একটার পর একটা চমৎকার ভাস্কর্য নির্মাণ করছিলেন প্রায় দেড় বছর ধরে। এতো ভাস্কর্য নির্মাণ প্রসংগে তিনি বলেন, বিভিন্ন কৃত্তিমান বরেণ‍্য ব‍্যক্তিদের স্মরণে এ উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন তিনি। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, পঞ্চাশটিরও বেশি ভাস্কর্য  বানাতে সক্ষম শরিফ মাটি, হালকা বালু, পাটের আঁশ ও কাঠ দ্বারা নির্মাণ করতে সাহস পান।

এসব ভাস্কর্য দেখার জন‍্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোকজন প্রতিদিন দলে দলে ছুটে আসতো দামোদর গ্রামের বাড়িতে শরিফের মিনি সংগ্রহশালায়। ভাস্কর্য নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশ ও জাতির জন‍্য যাঁরা শহীদ হয়েছেন- যেমন মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, প্রগতিশীল, সুশীল ও আরো অনেক শিহরণ সৃষ্টিকারী লোক, যাঁরা ইহলোক ত্যাগ করেছেন, সে সমস্ত ব‍্যক্তি ও গুণীদের প্রতিনিয়ত এভাবে স্মরণে রাখা এবং মানুষ জন যেন দেখে তাঁদের স্মরণ করে রাখেন সেটিই ছিল তার মূল ইচ্ছা।

তিনি আরও বলেন, এ পন্থায় অগ্রসর হওয়াটা তাঁর একান্তই নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার আলোকে। তিনি বলেন, জাতির স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তার এই উদ্যোগ নয়। সংসার জীবনে আর্থিক অনটন ও প্রতিকুলতার মধ্যে সম্ভব হয়ে ওঠেনি আরও অনেক ভাস্কর্য নির্মাণের। অবশ্য তিনি পরপর দুবার ভাস্কর্য নিয়ে প্রদর্শনীও করেছেন।

ভাস্কর্য নির্মাণের কথা শেষ করতে না করতেই শরিফ ভাবতে শুরু করলেন মিডিয়ার স্বপ্নের কথা। বুকে লালন করা মিডিয়ার চিন্তা ছিল তাঁর গভীরে। সে চিন্তার আলোকে নানা প্রতিকুলতার ম‍েধ্যই শুরু করেন নাটক লেখা। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল মিডিয়াতে কাজ করার। লেখাপড়ার ঝামেলায় হয়ে উঠেনি। অবশ্য তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পাশ করেছেন। এরপর জীবন সংগ্রামের মাঝে আকিজ গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানে পেয়ে যান একটি চাকরি। যশোর জেলায় অভয়নগরের নওয়াপাড়ায় কর্মরত আছেন তিনি। সেখান থেকে খুলনায় ফিরেই শুরু হয় নাটক লেখা। তিনি প্রতিদিন কর্মস্থল থেকে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে ফিরেন। কারণ বাড়ি না আসলে সংসার দেখশোনা হয় না যে।

দামোদর গ্রামের শরিফের হঠাৎ বিটিভির উপস্থাপিকা শায়লা সাবরিন পলির সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁরই হাত ধরে তিনি বিটিভির নিজস্ব প্রযোজক নূর আনোয়ার রঞ্জুর সঙ্গে ২০১২ সালে ঈদের জন‍্য তাঁর লেখা ‘দুই চোর’ নামে একটি নাটক প্রযোজনা করেন। পরিচালনায় ছিলেন মাসুদ চৌধুরী। এরপর মিডিয়া ভিশনের শ্রদ্ধেয় মোল্লা ফরিদ আহম্মেদের সহায়তায় শাহাদাৎ আলম ভূবনের পরিচালনায় ‘দশ টাকার লাভ স্টোরী’ নামের আরেকটি নাটক পরিচালনা করেন। এরপর আরোও অনেকগুলো একক নাটক, একটি বায়ান্ন পর্বের দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক, দুটি টেলিফিল্ম, একটি আর্ট ফিল্ম, একটি উপন‍্যাস, অনেক কবিতা ও গানসহ নানা রকমের মজার মজার পান্ডুলিপি তিনি লিখেছেন।

নাট্যকার শরিফুল ইসলাম শরিফের নাট্য তালিকায় রয়েছে একক নাটক ‘দুই চোর’, ‘দশ টাকার লাভ স্টোরি’, ‘হাইব্রিড চিটার’, ‘ঘোড়া রোগ’, ‘সাদা খামে নীল চিঠি’, ‘জীনের বাদশা’, ‘পরের কথায় ঘরে আগুন’, ‘ভালবাসা চাই’, ‘অতি লোভে তাতি নষ্ট’, ‘হৃদয় ভাঙ্গা ডেউ’, ‘কোচিং সেন্টার’, ‘প্রমোশন’, ‘হযবরল’, ‘ইস্মার্ট আনইস্মার্ট’, ‘ভন্ড কবিরাজ’, পারুলের লজিং মাষ্টার’, ‘অবশেষে ভালবাসা’, ‘ইত‍্যাদি।

নজরুল ইসলাম তোফার গল্প নিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘স্টাইল বয়’। টেলিফিল্মও লিখেছেন দুটি, ‘সুপ্ত মনের বিকাশ লাভ’ ও ‘দুটি মন কাছে টানে’। তাঁর নাটক লেখার গতি যখন অনেক বেড়ে যায় তখনই লিখেছেন দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক ‘চগা দিয়ে বগা বাধানো’। আর্ট ফিল্ম লিখেছেন- ‘এক মুঠো ভাতের জন‍্য’ এবং একটি উপন‍্যাস ‘রঙ্গীন প্রজাপতি’।

নজরুল ইসলাম তোফাকে বলেন, টাকার দুনিয়ায় শুধু টাকা। কথায় আছে ‘খালি সুতায় গিরে আটে না’। যেখানেই যান সেখানেই চায় শুধু টাকা। কেউ কথা দিয়ে কথা রাখে না। এ পর্যন্ত অনেক প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি। বর্তমানে আর্থিক নিপীড়নের শিকার হয়ে কোন রকম ভাবে বেঁচে আছেন। তাই ভাল কোন মিডিয়ার সহায়তা পেলে পুরানো সেই নাটক লেখার অভ্যাস পুনরায় চালু করতে পারেন খুব ভালো ভাবে। সংসারের অনেক অভাবের মাঝেও প্রতিভাকে কখনও গলা টিপে শেষ করতে চান না তিনি।

বাংলার কথা/অক্টোবর ০৩, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com