Today June 16, 2018, 5:23 pm |
Home » খোলামত » ‘ভাই! কিছু আছে?’

‘ভাই! কিছু আছে?’

আলী আজগর খোকন ০

সংবাদমাধ্যমের ছাত্র নই। ফলে এই সেক্টরে জ্ঞান আহরণের তেমন সুযোগও হয়নি। শখের বশে ‘গাইতে গাইতে গায়েন আর বাজাতে বাজাতে বায়েন’ এর মতো যতটুকু জানার সুযোগ হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে এই সেক্টরের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা-সামর্থ্য আমার নেই। নেশা থেকে পেশার আকাঙ্খায় কিছু অভিজ্ঞতা ঝুলিতে আপনা থেকেই জমা হয়েছে। বড়াই করে বলার মতো সম্পদ বলতে এটুকুই। অভিজ্ঞতার বাহাদুরি থেকে দু’চার লাইন বয়ানের এই অবতারনা মাত্র।

প্রত্যেক পেশার সঙ্গে পেশাদারী কিছু শব্দ থাকে। এসব শব্দের মধ্যে কিছু থাকে পুঁথিগত। কিছু থাকে ব্যবহারিক। এগুলো ‘প্রফেশনাল ওয়ার্ড’ নামে পরিচিত। শব্দগুলো সবসময় যে ব্যাকরণ মেনে ব্যবহৃত হয়, তা নয়। অনেক সময় শব্দের সঙ্গে অর্থের বাস্তবিক কোন মিলও থাকে না। বিশেষ করে ব্যবহারিক শব্দগুলোর। কিন্তু এর ভাবগত অর্থ সংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত সবাই বুঝে নেয়। ব্যবহারিক শব্দগুলো আবার অভিজ্ঞতা আচরণ থেকে সৃষ্ট। পারিপার্শ্বিক ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এই ধরণের শব্দের প্রয়োগ হয়ে থাকে। সাংবাদিকতায় সংবাদকর্মীরা যেমন ‘ভাই, কিছু আছে?’- শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। পুঁথির পাতায় এই শব্দের উপস্থিতি আছে কিনা জানা নেই।

ক্যাম্পাস ও ঢাকার সাংবাদিকতার ক্ষুদ্র সময়ে অনেকের মুখেই ‘ভাই, কিছু আছে?’ শব্দের প্রয়োগ দেখেছি। শব্দটি প্রথম শুনি আবু কালাম রতন ভাইয়ের মুখ থেকে। আবু কালাম রতন ভাই তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দি ডেইলী স্টারের রিপোর্টার। আমায় ডাকতেন ‘খোকন সোনা’ বলে। ঘটনাটি সম্ভবত ২০০৬ সালের। দুপুর দেড়টার দিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পিছনে ঘর্মাক্ত দেহে মেহেরুল হাসান সুজনসহ বসে আছি। রতন ভাই হন্ত-দন্ত করে আসলেন। কপালের ঘাম নাক বেয়ে পড়ছে। বললেন- ‘খোকন, ‘কিছু আছে?’ অবস্থা বেগতিক মনে হলো। চার-ছয়, আগ-পাছ কিছু না ভেবে বললাম, ‘না ভাই, ‘কিছু নাই’।

এর কিছু সময় পর মুনছুর আলম ভাই আসলেন। মুনছুর ভাই রাজশাহীর প্রভাবশালী স্থানীয় ‘দৈনিক সোনালী সংবাদ’র বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার। ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ‘সংবাদের ভাণ্ড’ বলা হতো তাঁকে। যে যত খবরই সংগ্রহ করুক, মুনছুর ভাইয়ের কাছে আর কী সংবাদ আছে- তাই নিয়ে সবার অস্থিরতা থাকতো। ডানপন্থী-বামপন্থী, সোজাপন্থী-বাঁকাপন্থী, লালপন্থী-নীলপন্থী, গোপনপন্থী-প্রকাশ্যপন্থী- সবপন্থী সংবাদকর্মীই মুনছুর ভাইয়ের শেষ বয়ানটা নিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতেন।

রতন ভাই মুনছুর ভাইকে বললেন, ‘মুনছুর, ‘কিছু আছে?’ মুনছুর ভাই বললেন- আছে, আগে বসেন। কথা না বাড়িয়ে আমতলায় সিমেন্টের রাউন্ড বেঞ্চে বসে পড়লেন রতন ভাই। আমরাও জনা দশেক মুনছুর ভাইকে ঘিরে কাগজ-কলম হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। বয়ান শুরু হলো- আইন বিভাগের ভর্তি জালিয়াতি চক্রের কয়েক সদস্যকে পাকড়াও করা হয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি বলে পুরো বয়ান দিলেন। রতন ভাই, কুদরাত-ই-খুদা বাবু ভাই, জোহায়ের ইবনে কলিম ভাই, আনিসুজ্জামান উজ্জল ভাই, শহীদুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন ঘটনার আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিলেন।

মুনছুর ভাইয়ের বয়ান শুরু হতেই আমার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। জানা বিষয় বলতে না পারার আফসোস শুরু হয়ে যায় নিজের মধ্যে। আহ্ কী মিস করলাম। যেন ভাইভা পরীক্ষায় নিজের বাপের নাম ভুল করে ফেললাম। যারপর নাই আফসোস। ঘটনার জন্ম-মৃত্যু পুরোটাই তো জানি। কারা করলো জালিয়াতি। ডুপ্লিকেট প্রবেশপত্র, ডুপ্লিকেট সিল কারা বানালো। চক্রের সদস্য হিসেবে আরো কারা আছে। এই চক্র আরো কয়বার এই জালিয়াতি করেছে। জালিয়াতি করে টাকা-পয়সা কীভাবে, কার কাছ থেতে কত টাকা করে নেয়া হয়েছে। কারা কীভাবে টাকা দিয়েছে। অভিভাবকদের বক্তব্য কী। কার বাড়ি কোথায়। কার জিপিএ কত। ছেলে কয় জন, মেয়ে কয়জন। এদের মধ্যে কার কার সাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগাযোগ আছে- ইত্যকার প্রশ্নের সলিড উত্তর তো আমার কাছেই আছে। কিন্তু ‘কিছু আছে?’র বয়ান দিতে না পেরে যেন ক্যারিয়ারে মার খেয়ে গেলাম। বড় ভাইদের সু-দৃষ্টি আর পেলাম না। তবুও ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো সংবাদের আশায় তাদের পিছে পিছে ঘুরি। আর অপেক্ষায় থাকি সিনিয়রদের মধ্যে কে, কবে ক্যাম্পাসে আসেনি। সুযোগ নিই। আমায় ‘কিছু আছে?’র বিষয়ে কেউ কছু জিগায় কি না। জিগালেই সুন্দর বয়ান। তাহক্কিক, তরকীবসহ বাহাস-বয়ান। এভাবে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা শেখার নেশায় বড় ভাইদের সাথে ঘুরেছি বহুদিন, বহু মাস। একময় নির্ভরতা ফিরে পাই। দুয়েকজন জিগায়, ‘খোকন সোনা, ‘কিছু আছে?’ ভাব, বিনয় আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলি, হ্যাঁ ভাই, আছে……..ইত্যাদি।

সাংবাদিকতা পেশাটাকে চর্চানির্ভর ও গুরুমূখী মনে হয়। গুরুমূখী বিষয়টার মানে হলো, সিনিয়র বা বড় ভাইদের কাছ থেকে হাতে কলমে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম কিছু বিষয় জানা। যা চর্চাবাহিত পরম্পরা ছাড়া হাসিল করা কঠিন। সারাদিনের অগোছালো সংবাদগুলো কীভাবে সুন্দর করে সাজানো হয়। পত্রিকায় প্রকাশোপযোগি করা হয়। সংবাদ লেখার সময় পাশে বসে থেকে শব্দ চয়ন খেয়াল করা। নিজের সংবাদ নিজেই এডিট করা। বাক্য ভেঙ্গে নতুন বাক্য তৈরি করা। কোন একটা সংবাদের আদ্যোপান্ত বড়ভাইদের জানাতে পারলে নিজেকে স্বার্থক মনে হয়। আমার ওপর তাঁদের আস্থা বেড়ে যায়। যে কোন প্রয়োজনে নানামূখী বিষয়-আশয় জানতে চান তারা। এভাবে যোগাযোগের মাত্রাটা ঘণ হয়, শক্ত হয়। সম্পর্কের উন্নতি হয়। সংবাদের বিভিন্ন এঙ্গেল পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরণের স্পেশাল ও ফিচার আইটেমের আইডিয়া পাওয়া যায়। উজ্জল ভাই আর মুনছুর ভাই আমাকে ‘কিছু আছে?’র জবাব না হলে নতুন নতুন নিউজের আইডিয়া দিতেন। বলতেন, একটু খাটাখাটি করো। ভালো একটা স্টোরি হবে।

২০০৯ সাল। বুঝতেই পারিনি, সিনিয়র হয়ে গেছি। নিজের গণ্ডি বেড়েছে। কাজের মাত্রা বেড়েছে। যোগাযোগের মাত্রা বেড়েছে। নানাজনের সঙ্গে খায়-খাতির বেড়েছে। ফলে ক্যাম্পাসের ছোট খাটো সংবাদের বিষয়ে খুব বেশি সময় দেয়া হয় না। কাছে-কূলের জুনিয়র যারা তাদের বলি, ‘কিছু আছে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না শব্দ আসতো। যদিও হ্যাঁ শোনা যেতো, বিবরণ শুনে তৃপ্তি পাওয়া যেতো না। সংবাদের বিবরণ পরিস্কার থাকতো না। এমনটা হওয়ার কিছু যৌক্তিক কারণও ছিল। ক্যাম্পাসে সংবাদকর্মীরা কয়েক গোত্রে, উপ-গোত্রে বিভক্ত। ফলে সংবাদের ‘সিক্রেসি’ রক্ষার জন্য ‘কিছু আছে?’র স্বীকার ও বিবরণ দেয়া থেকে বিরত থাকতো। আবার অনেকে জোর করে জুনিয়রদের ডেকে এনে নাম-বংশ-কুল রক্ষার জন্য দলে ভিড়াতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা হতো আনকোড়া। এরা ‘অনুরোধে ঢেগি গিলে’ হজম করতে পারতো না। তার মানে, সূত্র খুঁজে সংবাদের গভীরে যেতে চাইতো না।

‘কিছু আছে?’ শিরোনামের বিষয়টা নিয়ে কখনো কারো সঙ্গে আলাপ হয়নি। বন্ধুবর সুজনের সঙ্গেও না। কিন্তু শব্দটা সবসময় আমাকে চমক দিতো। শুনতে ভালো লাগতো। বলতেও ভালো লাগতো। মনে হতো, কিছু শিখছি বা কাউকে শিখাচ্ছি। এক সময় শব্দটা সিনিয়রদের কাছ থেকে শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু যখন নিজেই সিনিয়রের দলে চলে গেছি, তখন আর কেউ জিগায় না।

একদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আমতলায় জোহা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। জোহা ভাই আবার তাবলিগওয়ালা মানুষ। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা নিয়ে বিশাল এক গবেষণাপত্র আছে তাঁর। কথা বললে রাগ করে না সহজে। ভাবলাম, আজ জোহা ভাইকে জিগাবো ‘কিছু আছে’ কিনা। লম্বা সালাম দিলাম। অপ্রাসঙ্গিক কথা হচ্ছে দু’জনের মধ্যে। কিন্তু আমার নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে গেছে। ভাবছি, জিগানোটা বেয়াদবি হয় কিনা। দুরু দুরু বুকে দুঃসাহস নিয়ে বললাম, ‘ভাই, ‘কিছু আছে?’ প্রশ্নটা শুনে আমার মুখের দিকে তাকালেন জোহা ভাই। প্রায় আধা মিনিট। একটু পরেই রতন ভাই আসলেন। দু’জনের উপস্থিতি দেখে আমার টি-শার্ট ঘেমে গায়ে লেপটে গেল।  খানিকপর উত্তর এলো, না কিছু নেই। তোমার কাছে ‘কিছু আছে?’

সাংবাদিকতা জীবনে ‘কিছু আছে?’ শব্দটার মূল্যায়ন আমার কাছে আলাদা। ঢাকায় এসেও এই শব্দটার সঙ্গে সংসার করেছি। প্রথম আলোর কাজী আনিস, এবিসি রেডিও’র কামরুল হাসান, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র রিয়াজ ও জুনায়েদ, শীর্ষ নিউজের জাভেদ ও ইমতিয়াজ, সমকালের শাহাদাত হোসেন পরশ ও আতাউর রহমান, কালের কণ্ঠের রেওজায়ান ভাই, যুগান্তরের সারোয়ার ভাই, কি সাক্ষাতে কি মোবাইলে সালাম বিনিময়ের পরই বলে বসতেন, ভাই, ‘কিছু আছে? মানে পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য কোন সংবাদ বা খবর আছে কি না। এই ধরণের একটা প্রশ্ন শোনার জন্য প্রস্তুত মানে, কোন  না কোন খবর নিজের অবগতিতে রাখা। কোন খবরই যদি পত্রিকায় প্রকাশের উপযোগি না হয়, তবু যেন একজন সংবাদকর্মীর দিনটি বৃথা না যায়।

আমাদের চারপাশে লেখার জন্য অসংখ্য উপাদান আছে। ২৪ ঘন্টা দিনটি একজন রির্পোটারের কাছে সবসময়ই ২৬ ঘন্টা। এটি আমার উপলব্ধি। একজন রিপোর্টারকে অন্য সবার থেকে সবসময় এগিয়ে থাকতে হয়। এ কারণে দিনের ঘন্টাকে টেনে লম্বা করে কাজ করতে হয়। প্রতিদিন অন্তত একটি করে সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশের উপযোগি করে রাখা উচিত। কারণ, এটাই একজন রিপোর্টারের কাজ। এটাই চাকরি। চাকরিই রিপোর্টারের ইবাদত। ইসলামে রুজি তালাশকে ইবাদতের সঙ্গে মিলানো হয়েছে। তাই প্রস্তুতকৃত সংবাদটি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করুক আর নাই করুক, অন্তত ভাষার দক্ষতা বাড়লো। কিছু না কিছু জানা হলো।

লেখক : আলী আজগর খোকন, সাবেক সংবাদকর্মী, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কর্মকর্তা পদে চাঁদপুরে কর্মরত। মুঠোফোন : ০১৭১৭৮২৭৩২৪

বাংলার কথা/মে ২৯, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com