Today May 27, 2018, 9:26 pm |
Home » অন্যান্য » বিড়ম্বনার শিকার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্প কর্মকর্তারা !

বিড়ম্বনার শিকার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্প কর্মকর্তারা !

মাসুম বিন সুলতান 0
সুশিক্ষার পূর্বশর্র্ত হচ্ছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকরাই হচ্ছেন জাতি গঠনের প্রধান কারিগর। সেজন্য ১৯৯৯ সাল হতে মাধ্যমিক শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সেকেন্ডারী এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টম্যান্ট প্রজেক্ট (সেসিপ) নামে একটি প্রকল্প শুরু হয়। যার পরিপূর্ণ কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সাল থেকে।নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে কারিকুলাম উন্নয়ন, প্রশ্নপত্র সংস্কারের মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি, বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যালয়সমূহের অধিকতর উন্নয়ন,বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার উন্নয়নে বিদ্যালয়সমূহের সক্ষমতা সৃষ্টি, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রবর্তন যা সেসিপ কর্তৃক বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেসিপ নিয়োজিত সহকারী পরিদর্শক, একাডেমিক সুপারভাইজারগণ এই কর্মযজ্ঞের সার্বিক সমন্বয় সাধন ও নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়গুলোকে কাঙ্খিত সহায়তা প্রদান করে চলেছে।

 

 

সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) এর মূল উদ্দেশ্য “গণগত মান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সমান সুযোগের ভিত্তিতে মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের মাধ্যমে একটি অধিক প্রাসঙ্গিক মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন”। এই লক্ষ্যে সারা দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের ১৮ হাজার ৫৯৮ টি প্রতিষ্ঠানে সেসিপ কর্মকর্তাগণ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। সেসিপ কর্মকর্তাগণ বিশ্বাস করেন এভাবেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে স্বপ্ন দেখতে উজ্জীবিত করা এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাবার প্রতিবন্ধকতাসমূহ অপসারণ করে মাধ্যমিক শিক্ষাকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

 

 

কোন পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য তিনটি প্রধান আবশ্যিক উপাদান হচ্ছে (ক) পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম সম্পর্কে শিক্ষকদের (শিক্ষাক্রম বিস্তরণ) প্রশিক্ষণ (খ) নবপ্রণীত পাঠ্য পুস্তুক এবং (গ) শিক্ষক নির্দেশিকা। এছাড়া পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম বিদ্যালয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মনিটারিং; বিশেষত মেনটরিং করার ব্যবস্থাও চলমান রাখতে হয় যা বর্তমানে সেসিপ প্রোগ্রামে কর্মরত সহকারী পরিদর্শক, একাডেমিক সুপারভাইজার, গবেষণা কর্মকর্তা, জেলা ট্রেনিং কো- অর্ডিনেটর ও সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার দ্বারা সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে।

 
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন দেখা যায়। আর এ পরিবর্তনের জন্য সরকার নানামুখী কর্মসূচি পরিচালনা করে যাচ্ছেন। আর সেসব কার্যক্রমের মধ্যে বিনামূল্যে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বই বিতরণ, বৃত্তি ও ছাত্রীদের উপবৃত্তি ইত্যাদি যা ছাত্র ছাত্রীদের ঝরে পড়া রোধে অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু অনুতাপের বিষয় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সঠিক ভাবে তত্ত্বাবধান করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল যেমন ডিপিও, টিও, এটিও, পি.টি.আই ইন্সট্রাক্টর ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোকে তত্ত্বাবধান করার জন্য সংখ্যালঘু কর্মকর্তা লক্ষ্য করা যায় যা দিয়ে পরিপূর্ণ রূপে মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

 

২০০৩ সাল থেকে সেসিপ প্রকল্পে নিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন পদে বেশ কিছু জনবল নিয়োগ দেয়া হয়, যে নিয়োগ পরিক্রমায় উল্লেখ ছিল উক্ত প্রকল্পের মেয়াদ শেষে উক্ত জনবল কে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে এবং সচিব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে আশ্বস্ত করা হয় যে, তারা যেন বিসিএস বাদে অন্য কোন চাকুরীতে দরখাস্ত না করে এবং উক্ত পদে মনোযোগ সহকারে কাজ করে। কিন্তু পাঁচ বছর পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তাদের কে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর তো দূরের কথা তাদের কে পুনরায় পরীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়। এরই মাঝে অনেক কর্মকর্তার বয়স সরকারি চাকুরীতে প্রবেশ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আবার ২০১৪ সালে জুলাই মাসে সেপিপ এর ৫,৭, ৯, ১১ এবং ১৬ গ্রেডের সকল আইসিটি ও ডাটা এন্টি অপারেটর পদকে অত্যাবশ্যকীয় জনবল হিসেবে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু বাকী রয়ে যায় সহকারী পরিদর্শক, গবেষণা কর্মকর্তাসহ একাডেমিক সুপার ভাইজার পদের বেশ কিছু গুরুপূর্ণ কর্মকর্তা যারা শিক্ষার গুনগত মানন্নোয়নের জন্য নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, এমতাবস্থায় ২০১৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদেরকে চাকুরী হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। যা ২০১৫ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ এক বছর পর পুনরায় নিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয় যেখানে ৭/৮ বছর একই পদে চাকরী করার পরও সে পদটি ধরে রাখতে ৩৫/৪০ বছর বয়সে সদ্য পাশ করা প্রার্থীর সাথে নামতে হয় প্রতিযোগীতায়। আবার বলা হয় যে ২০১৭ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হবে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন ? প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর পরীক্ষা দেওয়ার কথা মাথায় রেখে মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন কতটা সম্ভব ?

 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ সমস্যার সমাধান করেছে প্রায় ১০ বছর আগে। যে পদগুলো রাজস্ব খাতে স্থান্তরের প্রস্তাব ছিল পিইডিপি-২ তে সব অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশক্রমে শিক্ষক ইউআইসি ইন্সট্রাক্টর পিটিআই ইন্সট্রাক্টর, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ মাঠপর্যায়ের প্রায় ১৫ হাজার পদ রাজস্বখাতে সৃজন করে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিইডিপি-৩ এ একই কাজ করা হয়েছে। কর্মসূচী চলাকালে কর্মসূচী থেকে বেতন পেয়েছে। কর্মসুচী শেষ হবাার পর রাজস্ব খাত থেকে বেতন পাচ্ছে তারা।

 

সেসিপ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যক্তিনিষ্ঠভাবে মাঠে নামানো হলেও মেয়াদান্তে দিতে হচ্ছে আবারো পরীক্ষা। এতে অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে কর্মকর্তারা যেখানে কর্মকর্তাদের নেই কোন নিরাপত্তা, নেই কোন আশার বাণি সেখানে কিভাবে তারা উন্নয়নের বাণি শুনাবে আমাদের ? তাই প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি যদি মাধ্যমিক শিক্ষার অব্যাহত উন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ ও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে চাই তাহলে সেসিপ এর সকল কর্মকর্তাদের অত্যাবশ্যকীয় জনবল হিসাবে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরের মাধ্যমে শিক্ষার অব্যাহত উন্নয়ন ধরে রাখতে হবে। নতুবা তিন বছর অন্তরালে প্রকল্প মেয়াদ বাড়িয়ে কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাছিল হলেও শিক্ষার মান ভঙ্গে পড়বে। তাই বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়তে চাইলে সেসিপ এর সকল কর্মকর্তাদের রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর করে কর্মকর্তাদের নিশ্চিন্তে কাজ করে ২০২১ সালের সধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই ভিশন ২০২১ বা শিক্ষার ১০০ ভাগ অর্জন সম্ভব হবে।

 

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে একাডেমিক সুপারভিশন এবং পরিবীক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শিক্ষানীতি অনুযায়ী একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ জোরদার করার লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের সংখ্যানুযায়ী বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ সৃষ্টি করতে হবে যাতে প্রতিটি বিদ্যালয় প্রতি মাসে অন্তত একবার বিস্তারিতভাবে পরিদর্শন করা সম্ভব হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে একাডেমিক সুপারভিশন করার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ব্যতীত রাজস্ব খাতের অন্য কোন জনবল না থাকায় পরিদর্শন, মনিটারিং, সুপাভিশনসহ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের এবং অফিসিয়াল বিভিন্ন কার্যক্রম যথাসময়ে ও সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশনা মতাবেক বিদ্যালয় পর্যায়ে নিবিড় একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ জোরদার করে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রোগ্রামে বর্ণিত পদসমূহ রাজস্ব বাজেটে সৃষ্টি করা অতীব জরুরী।

 

লেখক: মাসুম বিন সুলতান, শিক্ষা বিষয়ক গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com