Today May 27, 2018, 9:46 pm |
Home » জাতীয় খবর » বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মালিকানা বিভ্রান্তির যুক্তি কী

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মালিকানা বিভ্রান্তির যুক্তি কী

বাংলার কথা ডেস্ক ০

বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপিত হওয়ার পর বর্তমানে সেটি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে করতে নির্দিষ্ট অরবিটাল স্লটের দিকে এগুচ্ছে। গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে প্রাথমিক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত অরবিটে পৌঁছাতে সাত থেকে নয় দিন সময় লেগে যাবে। আর দুই মাসের মধ্যে স্যাটেলাইটটি পুরোদমে কাজ শুরু করবে।

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্বে স্যাটেলাইট আছে এমন দেশগুলোর মধ্যে ৫৭তম বাংলাদেশ। গৌরবের এ অর্জন উদযাপন করছে দেশবাসী। তবে এরই মধ্যে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির বাণিজ্য সম্ভাবনা ও মালিকানা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুকে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যাটেলাইটের মালিকানা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, এর মালিকানা চলে গেছে দুই ব্যক্তির হাতে। তবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বলছে ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তত্ত্বাবধান ও বাণিজ্যিক দিক দেখভাল করবে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসবি)। শিগগিরই এ কোম্পানিটা গঠন করা হবে।

 
বিতর্ক শুরু নিউইয়র্কে

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের আগেই এর ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ ও সিগন্যাল বিকিকিনি নিয়ে সৃষ্টি হয় বিতর্ক। এর সূত্রপাত দুটি কোম্পানিকে কেন্দ্র করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়েক মাস আগে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আয়োজিত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে সেখানে জানানো হয়, স্যাটেলাইট সিগন্যাল ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দের দায়িত্বে থাকবে দুটি প্রতিষ্ঠান। বেক্সিমকো গ্রুপ ও বায়ার মিডিয়া টিভি চ্যানেল ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ ও সিগন্যাল বিকিকিনির পুরো ব্যবসায়িক দিকটি উপভোগ করবে। এদের ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি এখানে ডিটিএস প্রযুক্তির ব্যবসায় নামতে পারবে না। এ বক্তব্যের পরপরই সাংবাদিকের প্রশ্নবানে জর্জরিত হন সেখানে থাকা বিটিআরসির কর্মকর্তারা। তবে এ প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান তারা।
পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনের কথাগুলো ভুল ইন্টারপ্রেট করা হয়েছে। অন্য টেলিভিশনগুলো বিভিন্ন স্যাটেলাইট থেকে সার্ভিস নেয়। সব টেলিভিশনগুলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে চলে আসবে। এটির জন্য তাদের বেক্সিমকো বা বায়ার মিডিয়ার পারমিশন নিতে হবে না। শুধু ডিটিএইচ সেবা দেবে এই দুই প্রতিষ্ঠান।’

 

বিসিএসবি চালু হওয়ার আগেভাগেই এই চুক্তি কীভাবে হয়, জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ চুক্তিটি আমাদের (বিটিআরসি) এখানে হয়নি। মিনিস্ট্রি অব ইনফরমেশন থেকে এ চুক্তিটি করা হয়েছে, সেখান থেকে তাদের এ অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ব্যবসার সম্ভাবনা

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে তিন ধরনের সুফল পাবে দেশের মানুষ। প্রথমত, এ স্যাটেলাইটের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সাশ্রয়-দুটিই করা যাবে। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনায় দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো সম্ভব।

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর মধ্যে ২৬টি কেইউ-ব্যান্ড ও ১৪টি সি-ব্যান্ডের। ওই ট্রান্সপন্ডারগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। এ কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ- ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এ স্যাটেলাইট দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না।

 

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের লক্ষ্যে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি। চুক্তি অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূস্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও নির্মাণে ঋণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পালন করছে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। উৎক্ষেপণের পর এক বছর স্যাটেলাইটটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে থ্যালেস এলেনিয়া। এরপর গাজীপুর ও বেতবুনিয়ার গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটি পুরোপুরি পরিচালনা করবে বাংলাদেশ। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩২ সদস্যের একটি দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

 
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনায় কোম্পানি

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত বছরের ৩ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য ১১ সদস্যের একটি কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছে, যাদের সবাই সরকারি কর্মচারী। এ ছাড়া কোম্পানিটির জন্য বাজারে ১০ টাকা মূল্যের পাঁচশ’ কোটি শেয়ার ছাড়া হবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অতিরিক্ত সচিব; অর্থ বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি এ কমিটিতে থাকবেন। এ ছাড়া টেলিকমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের মহাপরিচালক, স্পারসোর চেয়ারম্যান, সরকার মনোনীত দুইজন পরিচালক এবং বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কমিটিতে থাকবেন। পদাধিকার বলে সচিব চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকবেন। আর কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবেন কমিটির সদস্য সচিব। অন্যরা বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে কমিটিতে থাকবেন।

 
স্যাটেলাইট বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করা যাবে। এ ছাড়া যারা ভি-স্যাট ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান করছেন, তাদের কাজে আসবে। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারের জন্য এবং ডিটিএইচ সেবা অর্থাৎ বর্তমানে কেবল টিভির যে সংযোগ আছে সেটির মান উন্নয়ন করতে পারবে।

 

এ বিষয়ে ইন্টারনেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সিরাজুল হায়দার গণমাধ্যমে বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে কেবল টিভির ক্ষেত্রে। ট্রিপল প্লে অর্থাৎ ডিশ, ইন্টারনেট ও কলিং-এ তিনটি সেবা একসঙ্গে ডিটিএইচের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এতে করে প্রত্যন্ত এলাকায় এই সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।’
ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের একটি বড় গ্রাহক হবে। বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন বা অ্যাটকোর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো অ্যাপস্টার সেভেন নামের একটি বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বাংলাদেশের প্রতিটি টেলিভিশন স্টেশন মাসে ২৪ হাজার ডলার খরচ করে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ ডলার।’
বাংলাদেশের টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞ আবু সাইয়িদ খান বলেন, বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজার লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই স্যাটেলাইটের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, আগামী সাত বছরের মধ্যে সে খরচ উঠে আসবে বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে দুটি চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত, এর অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত, এর দূরত্ব। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো বর্তমানে অ্যাপস্টার নামে যে স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে সেটি বাংলাদেশের ওপরে ৯০ ডিগ্রিতে অবস্থান করছে। অ্যাপস্টার সেভেনের মাধ্যমে একদিকে দুবাই এবং অন্যদিকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত সম্প্রচারের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ইন্দোনেশিয়ার ওপর ১১৯ ডিগ্রিতে এবং বাংলাদেশ থেকে ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে এ স্যাটেলাইট থাকবে। ফলে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব হবে না। আরেকটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু তারপরেও এ বিষয়টি খুব বড় কোনো সমস্যা নয়।

 

সূত্র: খোলা কাগজ/বাংলার কথা/মে ১৪, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com