Today November 25, 2017, 7:41 am |
Home » সাহিত্য » ড. মির্জা গোলাম সারোয়ারের ছোটগল্প ‘ক্রস কানেকশান’

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ারের ছোটগল্প ‘ক্রস কানেকশান’

ক্রস কানেকশান

০ ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার, পিপিএম
অসুস্থতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে ফারহান হলে তার রুমে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ার সময় হঠাৎ তার মোবাইল ফোন বেজে উঠে। রিসিভ করে সালাম জানাতেই একটি অপরিচিতা মেয়ে মিষ্টি স্বরে বলেন –
: এটি কি সুফিয়ান সাহেবের নাম্বার?
: স্যরি, রং নাম্বারে এসেছে।
: দুঃখিত, আপনাকে ডিসটার্ব করলাম। এজন্য ক্ষমা করবেন বলেই মেয়েটি ফোন রেখে দেন।

মেয়েটির ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ এবং খুবই মোলায়েম সুরের কথা শুনে ফারহান কেন জানি কৌতুহলী হয়ে পরক্ষণেই মেয়েটিকে রিং করে বলে-
: স্যরি ম্যাডাম, কিছু মনে করবেন না। একটু আগে আপনার সাথে আমার কথা হয়েছে। আপনার কথা শুনে মনে হয়েছে, আপনি শুধু ভদ্রই না, একজন অসাধারণ ভাল মনের মেয়ে যার মধ্যে সৌজন্য বোধ এবং সততা রয়েছে। মেয়েটি কিছু বলার আগে ফারহান বলে, আপনার পরিচয় জানতে চাওয়া অবশ্যই অযাচিত এবং বেয়াদবি হবে। তাই পরিচয় জানতে না চেয়ে নির্লজ্জভাবে আমার পরিচয় আপনাকে জানাচ্ছি। যদিও এটা অনধিকার চর্চা। কি শুনছেন তো?

: শুনছি, বলে যান।
: ম্যাডাম, দয়া করে বিরক্ত বোধ করবেন না। সাধারণত: ক্রস কানেকশন হলে মেয়েরা ভালমতো জবাব না দিয়ে উত্তেজিতভাবে যা তা বলে থাকেন। কিংবা কোন কথা না বলেই রং নাম্বার বলে অভদ্রোচিতভাবে লাইন কেটে দেন। কিন্তু আপনি এর ব্যতিক্রম। আপনার ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখেছি।
: বলতে থাকুন।
: দেখুন, আপনাকে খুশী করার জন্য বলছি না।
: আমি খুশী না হলেও, বিরক্তবোধ করছি না। আপনি বলতে থাকুন।
: ম্যাডাম, আপনি হয়তো ভাবছেন, মেয়েদের সাথে কথা বলাই আমার অভ্যেস। কিন্তু আমি মোটেও সে ধরণের ছেলে নই।
: আমি কিছু ভাবছি না।

: আমার নাম ফারহান। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধ বিজ্ঞানে পিএইচডি করছি।
: আমি তো নাম জানতে চাইনি।
: নিজের নাম ঠিকানা না জানালে, আপনারটা পাবো কিভাবে? ফারহানের কথা শুনে মেয়েটি এবার জোরে হেসে জানায়,
: তার নাম নীলা। বাড়ী দিনাজপুর। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীতে অনার্স পড়ে। থাকে রোকেয়া হলে।
: শুনে খুশী হলাম এই কারণে যে, আমরা দু’জনাই একই বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার মানুষ। আমার বাড়ীও দিনাজপুরে, থাকি মগবাজারে ভাইয়ের বাসায়।
: আবার ফোন করলে খুশী হবো।
: তাই। ঠিক আছে আপনি অনুমতি দিলে এবং বিরক্ত না হলে আমি ফোন করবো।
: কখনোই বিরক্ত হবো না। বরং খুশী হবো। এই বলে নীলা ফোন রেখে দেয়। ফারহান আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে। কারণ জীবনে প্রথম সে কোন মেয়ের সাথে এতো দীর্ঘসময় আন্তরিকতার সাথে কথা বলতে পেরেছে।

পরের দিন খুব সকালে নীলা ফোন করে ফারহানের খবর নেয়। সেই যে শুরু। এরপর তারা সারাদিনে এমনকি রাতেও মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হয় না। ক্রমে তাদের ঘনিষ্ঠতা প্রেমে গড়ায়। দু’জনাই দুজনকে গভীরভাবে ভালবাসে। কিন্তু একদিন হঠাৎ নীলা মন খারাপ করে জানায়, বাবা তার বিয়ে ঠিক করেছে। বাবার একই কথা তার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে না করলে সে আত্মহত্যা করবে। শুনে ফারহান মন খারাপ করে।

এদিকে কয়েকদিন পর ফারহান নীলাকে জানায়, তার মৃত্যুশয্যায় থাকা বাবা বন্ধুকে তার জন্মের আগে ওয়াদা করেছেন তার মেয়ের সাথে ফারহানের বিয়ে দিবে। এবং মৃত্যুর আগে বাবা তার ওয়াদা পূরণ করে যেতে চান। ফারহান এবং নীলা দু’জনাই দুঃখ পায়। এসময় তাদের দুজনের চোখ বেদনা ভরা অশ্রুতে ভরে যায়।

ইদানীং ফারহান ঠিকমতো বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। এমন কি মাঝে মাঝে না খেয়েই বেলা শেষে ঘরে ফেরা ক্লান্ত পাখির মতো বিছানায় শুয়ে নীলার কথা ভেবে সময় কাটিয়ে দেয়। সে ভাবে, কেনই বা নীলার সাথে তার পরিচয় হলো? আর পরিচয় যদি হলোই, তবে কেন এই বিচ্ছেদ? ক্রমেই তার শরীর খারাপ হতে থাকে। সংবাদ শুনে মা শিগগির তার বিয়ের আয়োজন করেন। এদিকে নীলাও বুকের মধ্যে একরাশ যন্ত্রণা চেপে রেখে ভাবে, কেন ফারহান তার জীবনে এলো? তার বিরহে আকাশ ছোঁয়ার রঙ্গীন স্বপ্নগুলি এখন শুধুই দুঃস্বপ্ন এবং স্মৃতি হয়েই রবে।

কিছুদিন পর ফারহান বিয়ের আসরে তার স্ত্রীর কবুল বলার কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে। কেন জানি সেই কন্ঠস্বর তার খুবই চেনাজানা মনে হয়। অপরপক্ষে ফারহানের কবুল বলার শব্দে মেয়েটিও চমকে উঠে বিষ্ময়ভরা দৃষ্টিতে বরের দিকে চেয়ে থাকে।
: তুমি নীলা?
: জি হ্যাঁ। আমি ক্রস কানেকশনের সেই নীলা।
: তুমি ফারহান?
: জ্বি হ্যাঁ। আমিও সেই ক্রস কানেকশানের ফারহান।
বিস্মিত হয়ে দুজনাই দুজনকে দুচোখ ভরে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ভাবে, কি মধুর মিলন। কাকতালীয়ভাবে ক্রস কানেকশানের মোবাইল বন্ধু এখন বাস্তবে জীবন সাথী। এ সময় দুর থেকে একটি গানের সুর ভেসে আসে ………….. তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার ……………..।

 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা

 

 

বাংলার কথা/জুন ১২, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com