Today June 17, 2018, 4:36 am |
Home » উত্তরের খবর » এক সাথে চিরবিদায় নিলেন ২ বন্ধু দম্পতি

এক সাথে চিরবিদায় নিলেন ২ বন্ধু দম্পতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০
রাজশাহী নগরীর বরেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর মোঃ আব্দুল মালেক কয়েকদিন আগে ঘুরে এসেছেন নেপাল থেকে। সেদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছিলেন বড় বোন হুরুন নাহার বিলকিস বানুকে। ৬১ বছরের বানু কিছুদিন আগে অবসর নিয়েছেন শিক্ষকতা পেশা থেকে। নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। ছোট ভাইয়ের কাছে প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি নেপালের বর্ণনা শুনে অবসর জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে বেড়াতে যাবার সিদ্ধান্ত নেন নেপালে।

 

মোঃ হাসান ইমাম

হুরুন নাহার বিলকিস বানুর স্বামী মোঃ হাসান ইমাম সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব। সর্বশেষ চাকরি করেছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পরিচালক পদে। গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। কিছুদিন আগে চাকরি থেকে অবসরের পর স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বাড়ির পাশে রাজশাহী নগরীর শিরোইল এলাকার ১৭২ নম্বর বাসার ৬ষ্ঠ তলার বি ইউনিট ভাড়া নিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। বিলবিস বানু ও হাসান ইমাম দম্পতির ২ ছেলে কানাডা প্রবাসী। বড় ছেলে কায়সার ইমাম সেখানে চাকরি করেন। ছোট ছেলে তৌকির ইমাম সম্প্রতি এমএস শেষ করে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়েছেন।

 

হুরুন নাহার বিলকিস বানু

বিমানে উঠতে ভয় পেতেন হুরুন নাহার বিলকিস বানু। এ কারণে কানাডা প্রবাসী ছেলেদের ডাক উপেক্ষা করেছেন একাধিবার। বিমানে উঠতে হবে জেনেই ছেলেদের কাছে কানাডা বেড়াতে যাননি কোনদিন। অবসর জীবনে নেপালে বেড়াতে যাবার জন্য সোমবারই প্রথম উঠেছিলেন ইউ-এস বাংলা’র বিমানে। প্রথমবারের মতো বিমানে উঠলেও স্বাভাবিকভাবে নামতে পারেননি বিমান থেকে। সোমবার নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত ইউ-এস বাংলা’র ফ্লাইটে নিহত হন হুরুন নাহার বিলকিস বানু ও মোঃ হাসান ইমাম দম্পতি।

মোঃ নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম ছিলেন মোঃ হাসান ইমামের ঘনিষ্ট বন্ধু। প্রায় এক বছর আগে চাকরি থেকে এলপিআরে যান। নজরুলের স্ত্রী আখতারা বেগম ছিলেন রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের শরীরচর্চা বিভাগের শিক্ষিকা। ছয় মাস আগে তিনি এলপিআরে যান। এ দম্পতির বাড়ি রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকায়। নজরুল ও হাসান ইমাম এবং তাদের স্ত্রী চারজনই লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ফলে এই দুই দম্পতির পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্টতা ছিল বেশি। হাসান ইমাম দম্পতি নেপালে বেড়াতে যাচ্ছেন শুনে নজরুল ইসলাম দম্পতিও তাদের সাথে নেপালে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গত বুধবার তারা একসাথেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রাজশাহী ছেড়েছিলেন। সোমবার দুই দম্পতি একসাথেই ঢাকা থেকে ইউ-এস বাংলার বিমানে উড়াল দিয়েছিলেন নেপালের উদ্দেশ্যে। পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ট দুই দম্পতি সোমবার নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউ-এস বাংলার বিমান বিধ্বস্তে একত্রেই আচ্ছন্ন হয়েছেন চিরঘুমে।

 

হাসান ইমাম দম্পতির ভাড়া বাসায় সুনশান নীরবতা

বুধবার সকালে নগরীর শিরোইল এলাকার হাসান ইমাম দম্পতির ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায় সুনশান নীরবতা। পড়ে আছে আসবাবপত্র, ল্যাপটপ ও সেলভর্তি বই। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে তাদের ছবি। দুই ছেলের বাঁধাই করা ছবিও টানানো রয়েছে দেয়ালে।
নিহত হুরুন নাহার বিলকিস বানুর ছোট ভাই বরেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর মোঃ আব্দুল মালেক জানান, ‘আমাদের নয় ভাই-বোনের মধ্যে বিলকিস আপা ছিলেন পঞ্চম। তার দুই ছেলে তারা কানাডায় থাকে। বিলকিস আপা উড়োজাহাজে চড়তে ভয় পেতেন। তার দুই ছেলে মাকে একাধিকবার কানাডায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু উড়োজাহাজে উঠার ভয়ে তিনি ছেলেদের কাছে যাননি। আমার কাছে নেপালের সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনে এই প্রথম তিনি উড়োজাহাজে চড়ে নেপাল বেড়াতে যাচ্ছিলেন। যে উড়োজাহাজে উঠতে তিনি ভয় পেতেন, সেই উড়োজাহাজই কেড়ে নিল তার প্রাণ।’

 

আখতারা বেগম

নিহত অপর দম্পতি নজরুল ইসলাম ও আখতারা বেগমের বাসার নাম ‘কাকন কটেজ’। নগরীর উপশহর এক নম্বর সেক্টরের এ বাসাটির নামকরণ করেছিলেন তারা বড় মেয়ের নামে। আখতারা বেগমের ভাগ্নে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, ‘তার খালার দুই মেয়ে কাকন ও কনক। তারা দু’জনেই ঢাকায় থাকেন। এদের মধ্যে কাকনের বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। তার কনক লেখাপাড়া করছে। রাজশাহীর বাড়িতে খালা ও খালুই থাকতেন। গত বুধবার তার খালা আক্তারা বেগম ও খালু নজরুল ইসলাম নেপাল বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় গিয়ে মেয়ে কাকনের বাসায় উঠেছিলেন। আগামী মঙ্গলবার তাদের রাজশাহী আসার কথা ছিল। যাওয়ার সময় তাকে বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য বলে গিয়েছিলেন।’

ঢাকা থেকে মুঠোফোনে কাকন জানান,‘তারা দুই বোন। ঢাকায় থাকেন। তাদের বাবা-মা রাজশাহীতে থাকতেন। নেপালের বিমানবন্দরে যে বিমানটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, তাতে তার বাবা-মা ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তারা তাদের মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছেন। কিন্তু এখনও তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। ভাবছেন, ঘরে ফিরবেন তাদের বাবা-মা।’

নেপালে বিধ্বস্ত বিমানে আরো ছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি। তিনি এখন কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বামী প্রকৌশলী রকিবুল হাসানের সাথে তিনি বেড়াতে যাচ্ছিলেন নেপালে। রকিবুলের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া গ্রামে। আর হাসির বাড়ি টাঙ্গাইলে। রুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ থেকে পাশ করে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন হাসি। তার স্বামী একই বিভাগের জিরো সিক্স সিরিজের শিক্ষার্থী ছিলেন। রকিবুল ঢাকায় একটি বেসরকারি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করতেন। হাসি রাজশাহীর মোন্নাফের মোড় এলাকায় ভাড়া থাকতেন। সোমবার কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান বিধ্বস্ত হলে গুরুতর আহত হন হাসি ও রকিবুল হাসান দম্পতি। হাসি এখন নেপালের হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তবে তার স্বামী রকিবুল হাসান চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

বাংলার কথা/মার্চ ১৪, ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোঃ হাবিবুর রহমান
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com