Today October 18, 2017, 2:50 am |
Home » অন্যান্য » ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি

ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি

আলী ইউনুস হৃদয় 0
ঈদযাত্রায় ভয় জাগাচ্ছে- একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম। ক্লাসে যাওয়ার পথে সংবাদপত্রে এমন শিরোনামে দেখে বুঝতে বাকি থাকে না ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের জন্য কি অসহনীয় ভোগান্তি অপেক্ষা করছে?

 

 

দেশের বিভিন্ন অংশের বেহাল সড়ক-মহাসড়ক এবার ঈদযাত্রায় ভয় জাগাচ্ছে। ছয়টি বড় মহাসড়কের মধ্যে চারটির বিভিন্ন অংশ ছোট-বড় গর্তে ভরা। বন্যায় নিমজ্জিত হয়ে অনেক জেলা সড়কও বিধ্বস্ত। সাময়িক মেরামত করলেও তা বৃষ্টির পানিতে আবার নষ্ট হচ্ছে। এই ছয়টি মহাসড়কের সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলারই কোনো না কোনোভাবে যোগসূত্র আছে। এ পরিস্থিতিতে ঘরমুখী মানুষ আর ঢাকামুখী কোরবানির পশুবাহী যানবাহনের যাতায়াত বেশ দুর্ভোগে ফেলতে পারে। আর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের মতে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবার ঈদযাত্রা মসৃণ হবে না। ( ২৪ আগস্ট ২০১৭, প্রথম আলো)

 

 

 

সড়কপথের যখন এই অবস্থা তখন সামনে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে সড়কের অবস্থা খুব খারাপ। এখন রংপুর থেকে ঢাকায় বাস আসতে এক দিন লাগে। গাজীপুর থেকে মহাখালী বাস আসতে লেগে যায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। সিলেটে এখন ১০-১২ ঘণ্টা লাগছে। সব মিলিয়ে যত ভোগান্তি ঈদ যাত্রায়। এছাড়া ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-বরিশাল এই চারটি পথের যাত্রায় ভয়ের মূল কারণ বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ। এর সঙ্গে সড়কে নির্মাণ আর সম্প্রসারণের কাজ যুক্ত হয়ে যানবাহনের গতি কমে তৈরি হচ্ছে যানজট।

 

 

 

অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দুটির চার লেনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছর। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রীদের মূল দুর্ভোগ ঢাকার যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী অংশের হাঁটুসমান গর্ত এবং মেঘনা-গোমতী সেতুর জট। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী অংশ বেহাল। ময়মনসিংহের পর জামালপুর ও নেত্রকোনার পথের মহাসড়কের অবস্থাও ভালো নয়। সবই দুর্ভোগের চিত্র।

 

 

 

ঈদকে সামনে রেখে দেশের সড়ক-মহাসড়ককে নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট করতে অন্তত ৩৪টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও ভারি বর্ষণের কারণে সারা দেশে সড়কব্যবস্থার যে দুরবস্থা, তাতে এবারের ঈদযাত্রায়ও হবে ভয়াবহ দুর্ভোগ। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রণালয় থেকে কাগজপত্রে ঈদের আগেই সব ঠিক করার নির্দেশ দিলেও কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়েও জনমনে রয়েছে সংশয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আগে-পরে সড়কব্যবস্থা স্বস্তিদায়ক করতে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। গত ২৪ জুলাই মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে অন্তত ৩৪টি নির্দেশনা দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট দফতর, অধিদফতর, বিভাগ, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকে।

 

 

 

 

গত ৯ আগস্ট সিরাজগঞ্জে বেহাল সড়ক পরিদর্শন করতে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মহাসড়ক চলাচলের উপযোগী করতে ১০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এরপর দেশের সড়ক-মহাসড়কে খোয়া-বালু এবং কোথাও কোথাও পিচ ঢালাইয়ের মেরামত চোখে পড়েছে। কিন্তু এগুলো টিকছে না। এর আগে ঈদুল ফিতরের আগে-পরে সড়কে বিপুল মেরামতকাজ দেখা যায়। সেটাও বিফলে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

 

 

 

প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ যখন দুয়ারে, তখন সড়ক মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমে আমরা দেখছি সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তারাও (সওজ) বলছেন, মহাসড়কে কত কিলোমিটার ভাঙাচোরা সেটা বড় কথা নয়। এক কিলোমিটার খারাপ সড়কের জন্যও পুরো মহাসড়ক অচল হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ঈদে মহাসড়কে প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটে। ঈদুল আজহায় পশুবাহী যানবাহনও বেশি বিকল হয়, যা দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তারপরও আশায় বুক বাধি যে, এবারে ঈদ যাত্রা সকলের জন্য স্বস্তির হবে।

 

 

 

 

ঈদ উপলক্ষে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয় ১৮ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে চলে ২২ আগস্ট মঙ্গলবার পর্যন্ত। আর ফিরতি টিকিট বিক্রি ২৫ থেকে শুরু হয়ে চলবে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত। জানা গেছে এবার প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২ লাখ ৬০ হাজার যাত্রী বহন করবে রেল। ১৮ আগস্ট যারা টিকেট সংগ্রহ করবেন তারা ২৭ আগস্ট ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। আর পর্যায়েক্রমে যারা ১৯ আগস্ট সংগ্রহ করবেন তারা ২৮ আগস্ট, যারা ২০ আগস্ট সংগ্রহ করবেন তারা ২৯ আগস্ট, যারা ২১ আগস্ট সংগ্রহ করবেন তারা ৩০ আগস্ট এবং যারা ২২ আগস্ট সংগ্রহ করবেন তারা ৩১ আগস্ট ভ্রমণ করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু অনেকে ট্রেন স্টেশনে পরপর ২/৩ দিন এসে টিকিট না পেয়ে ফেরত গেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। টিকিট প্রত্যাশীরা জানিয়েছেন, টিকিট ছাড়ার এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয় টিকিট শেষ। বিভিন্ন স্থানে যাত্রায় ট্রেনের টিকিট না পাওয়ায় মানুষের মাঝে ক্ষোভও দেখা গেছে।

 

 

 

 

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির নিয়মিত জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ১৯৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৯৭ জন নিহত ও ৫৪৮০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৯২ নারী ও ৩১৫ শিশু। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্ন মহাসড়ক, জাতীয় সড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে ২৬৫টি দুর্ঘটনায় ৩৪ নারী ও ৪২ শিশুসহ ৩৩৩ জন নিহত ও ৬৩২ জন আহত হন। এর মধ্যে ২৩ জুন ঈদুল ফিতরের ছুটির প্রথমদিন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আটদিনে ৭৩টি দুর্ঘটনায় ১১ নারী ও ১৫ শিশুসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদিকে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

 

 

 

 

সম্প্রতি রাজশাহী, বগুড়া, নাটোর, টাঙ্গাইল ঘুরে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের সড়ক ও মহাসড়কগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে ঢাকা থেকে বের হয়ে চন্দ্রা চৌরাস্তা পার হওয়ার পরই শুরু হয় দুর্ভোগের। টাঙ্গাইল পর্যন্ত যেন এ সড়ক একেবারেই ‘নরকে’ পরিণত হয়েছে। একদিকে সড়কটিতে চার লেনের কাজ চলছে, অন্যদিকে বিদ্যমান সড়ক ভেঙেচুরে একাকার। যমুনা সেতু পার হয়েও সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত এ সড়কের একই অবস্থা। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত সপ্তাহে ঢাকা থেকে বগুড়া পর্যন্ত মহাসড়কটি সরেজমিন পরিদর্শন করে রাস্তা বেহাল দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নির্দেশনা দিয়েছেন দ্রুত সড়ক মেরামতের। শুধু যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়ক বেহাল তা নয়, একই অবস্থা বগুড়া-নাটোর, নাটোর-রাজশাহী ও বনপাড়া-হাটিকুমরুল সড়কেরও। সঙ্গে এ দুই মহাসড়কের পিচ উঠে গিয়ে স্থানে স্থানে বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে।

 

 

 

 

ঈদের আগে সারা দেশে সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে যানবাহন চলা স্বাভাবিক রাখার নির্দেশনা ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের ওই সভায় আরও ৩৩টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈদের আগে ও পরে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যানজট নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগীয় কমিশনার, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

 

 

 

তাই ঈদ যাত্রার ভোগান্তি কমাতে সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনা হলে দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন দ্রুত সরিয়ে যানজট দূর করা, সড়ক-মহাসড়কের পাশের অস্থায়ী ও ভাসমান বাজার অপসারণ, মহাসড়কের ওপর ধান, পাট, খড়, কাঠ শুকাতে না দেওয়ার দিকে নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাস টার্মিনাল ও সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধেও কঠোর হতে হবে প্রশাসনকে। সঙ্গে ঈদের আগে ও পরে সড়কে সব ধরনের লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন চলা নিয়ন্ত্রণ করা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রাখতে হবে। মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইকসহ এ-জাতীয় ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন যাতে সড়ক-মহাসড়কে চলতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

 

 

এছাড়া যানজটের দুর্ভোগ কমাতে দেশের সব কটি মহাসড়কের সেতুতে টোল প্লাজার সব বুথ চালু রাখা, সিএনজি স্টেশন চালু রাখা, মহাসড়কে থ্রি হুইলার বন্ধ রাখা, ফেরিসংখ্যা বৃদ্ধি করা, ঈদের আগের তিন দিন ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যান বন্ধ রাখা, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে গরুর হাট না বসানো, কোরবানির পশু ও চামড়া পরিবহন ও বাজারজাতকরণে চাঁদাবাজি বন্ধেও সংশ্লিষ্ট জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। প্রত্যাশা করি, শুধু নির্দেশনা এগুলো সভা কিংবা কাগজেই আবদ্ধ না থাকে। সবশেষে বলতে চাই উপরোক্ত নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই কিছুটা এই ঈদ যাত্রার ভয় কমবে বলে আশা করছি। সকলের ঈদ যাত্রা সুন্দর ও শুভ হোক।

 

 

 

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে
সম্পাদক: শ.ম সাজু
সহকারী সম্পাদক (রংপুর বিভাগ): তিতাস আলম
২০৯ (৩য় তলা), বোয়ালিয়া থানার মোড়, কুমারপাড়া, রাজশাহী। ফোন: ০১৯২৭-৩৬২৩৭৩, ই-মেইল: banglarkotha.news@gmail.com